প্রভাত রিপোর্ট: নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে সরকারি কর্মচারীদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। নতুন কাঠামোয় উচ্চ গ্রেডে বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ হলেও নিচের গ্রেডগুলোতে তা ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাবে। তবে নতুন স্কেল ঘোষণার অর্থ সব সরকারি কর্মচারীর হাতে একসঙ্গে দ্বিগুণ অর্থ চলে যাওয়া নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা চাপ তৈরির আশঙ্কাও স্বীকার করেছেন তিনি। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সরকারের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে নতুন বেতনস্কেলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বিশেষভাবে দুটি সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। এর একটি হলো সরকারি কর্মচারীর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতি সন্তানের জন্য মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা। জাহেদ উর রহমান বলেন, এ অর্থ দিয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের সব ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব না হলেও রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো পরিবারগুলোর বাড়তি ব্যয় ও প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্র যখন কোনও সমস্যাকে রেকগনাইজ করে, তখন ভবিষ্যতে সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সহায়তাও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ব্যবধান কমানোর কথা বলেন তিনি। নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। এর ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত আগের তুলনায় কমছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে কিনা— এমন প্রশ্নে জাহেদ উর রহমান বলেন, কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে। তবে নতুন স্কেল ঘোষণার অর্থ সব সরকারি কর্মচারীর হাতে একসঙ্গে দ্বিগুণ অর্থ চলে যাওয়া নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ব্যাখ্যা, দীর্ঘ সময় নতুন পে স্কেল না হওয়ায় অনেক কর্মচারীর মূল বেতন বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে ইতোমধ্যে নতুন স্কেলের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে নতুন স্কেলে তাদের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির পরিমাণ ঘোষিত শতকরা হারের চেয়ে অনেক কম হতে পারে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “সরকার মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় মুদ্রানীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে চায়।”
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪১ লাখ পরিবারকে আনার জন্য তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। একটি পরিবারে গড়ে পাঁচ জন ধরে প্রায় দুই কোটি মানুষ এর মাধ্যমে সরাসরি সহায়তার আওতায় আসতে পারেন বলে জানান তিনি।
সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার কেনার পরিকল্পনা কোনও হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়— এটি সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি ‘ফোর্সেস গোল’-এর অংশ বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের তিন বাহিনীর মধ্যে বিমান বাহিনীর আধুনিক যুদ্ধবিমান সক্ষমতায় তুলনামূলক ঘাটতি রয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘‘বাংলাদেশের হাতে অল্পসংখ্যক মিগ-২৯ রয়েছে। এর বাইরে যুদ্ধবিমান বহরের বড় অংশ জে-৭ সিরিজের, যার প্রযুক্তিগত ভিত্তি অনেক পুরোনো। তিনি বলেন, ‘‘বর্তমান সময়ে আধুনিক বিমান বাহিনীতে ‘মাল্টিরোল ফাইটার’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই যুদ্ধবিমান দিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা প্রয়োজন।’’
উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশের সামনে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনসহ বিভিন্ন উৎসের বিকল্প রয়েছে। তুলনামূলক মূল্য, সক্ষমতা এবং পরিচালন ব্যয় বিবেচনা করে চীনা বিকল্পটি সরকারের কাছে সুবিধাজনক মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘সমমানের সক্ষমতা তুলনায় অনেক কম দামে পাওয়া সম্ভব—এটিও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।’’তিনি আরও বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের সক্ষমতা নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে সরকার মনে করছে।’’ তবে যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতির ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘‘অতীতে মিগ-২৯ কেনাকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির অভিযোগ ও মামলা হয়েছিল। সরকার সে অভিজ্ঞতাও মাথায় রাখবে।’’ ‘‘এটি কোনও আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন কেনাকাটা নয়, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ,’’ বলেন তিনি।
এদিকে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানবলেন, সাংবাদিকদের চাকরি ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে মানসম্মত সাংবাদিকতা পাওয়া সম্ভব নয় । সাংবাদিকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন না হওয়াকে একটি বাস্তব সমস্যা হিসেবেও স্বীকার করেছেন তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘‘বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ দেশের গণমাধ্যম খাতে আর্থিক ও কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।’’ সাংবাদিকদের বেতন কাঠামোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘নবম ওয়েজ বোর্ড হলেও সেটির কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি।’’ তার ভাষায়, ‘‘নীতিগতভাবে সাংবাদিকদের চাকরি এবং জীবিকাকে সঠিকভাবে নিশ্চয়তা দিতে না পারলে আমরা বেটার জার্নালিজম পাবো না।’’বিষয়টির সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ একমত উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের পেশাগত ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার দ্রুত কাজ করবে।’’
ব্রিফিংয়ে তিনি আরো বলেন, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। তবে এই সংখ্যাকে বর্তমানে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা হিসেবে দেখানো ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারের প্রসঙ্গ টেনে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘‘সংখ্যাটি মূলত নিখোঁজের ঘটনায় করা জিডির সংখ্যা। কোনও শিশু হারিয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা থানায় জিডি করেন। পরে তাদের একটি বড় অংশ পরিবারের কাছে ফিরে আসে। কাজেই জিডির মোট সংখ্যাকে এখনও নিখোঁজ থাকা শিশুর সংখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।’’ তিনি বলেন, ‘‘এক্সাক্টলি কতজন ফিরে আসেনি, সেই পূর্ণাঙ্গ ডেটা এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই।’’