• শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ন
Headline
জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতার আশ্বাস চায়না এক্সিম ব্যাংক প্রেসিডেন্টের নতুন আইফোন কেনার সময় আসল-নকল চেনার মূল উপায় কোন পদ্ধতিতে ডিম খাওয়া ভালো? বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা: ভারতের ছত্তীসগঢ়ের মৈনপাট হতে পারে দারুণ পছন্দ পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন পরিকল্পনা সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ও তার পরিবারের ৮৩ ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ আইনগত সহায়তার মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথ সুগম করতে হবে: আইনমন্ত্রী সব ধরনের দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়া স্থগিতের নির্দেশ স্থানীয় সরকার বিভাগের বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী ১০৩ ফ্লাইট ব্যাহত, ভোগান্তিতে ১৫ হাজার ৭৭৯ যাত্রী

বিশ্বজুড়ে হরমুজ সংকটের ধাক্কা, নজর এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে

Reporter Name / ১৩২ Time View
Update : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

প্রভাত ডেস্ক: হরমুজ প্রণালির সংকট যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, বিশ্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের পাহারাদারদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ তত গাঢ় হচ্ছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো সংঘাত বাধলে এই জলপথের অবস্থা কেমন হবে, তা নিয়েই উদ্বিগ্ন তারা।
সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান গত মাসে বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যদি প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধে জড়ায়, তবে হরমুজ প্রণালিতে এখন যা দেখছেন, তা ওই বড় যুদ্ধের একটা ট্রেলার (ড্রাই রান) মাত্র।’
সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া—এই তিন দেশের কোল ঘেঁষেই গেছে মালাক্কা প্রণালি। এটি হরমুজ প্রণালির চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ লম্বা এবং সবচেয়ে সরু অংশে হরমুজের চেয়েও ১০ গুণ বেশি সংকীর্ণ। পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়ার প্রধান বাজারগুলোতে যাওয়া তেলসহ বিশ্ববাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পণ্য এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। চীনের পণ্য পরিবহন এই প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দক্ষিণ চীন সাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে মালাক্কা প্রণালি।
একই সঙ্গে এই জলপথটি দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং ফিলিপাইনের মতো মার্কিন মিত্রদের জ্বালানিরও প্রধান ‘লাইফলাইন’। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত দেখা দিলে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে শক্তিশালী নৌ-উপস্থিতি বজায় রেখেছে। এশিয়ায় কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো বেশ কয়েকটি যুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর ৭ম নৌবহর সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এমন স্থায়ী উপস্থিতি সবসময়ই চীনের নেতাদের বিরক্তির কারণ। চীনও বসে নেই, তারা তাদের নৌবাহিনীকে দ্রুত আধুনিকায়ন করেছে এবং বর্তমানে এটি বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী। এই প্রণালির খুব কাছাকাছি বিশ্বের দুই পরাশক্তির অবস্থানের কারণে প্রশ্ন উঠেছে—হরমুজ প্রণালির মতো কোনো সংঘাত কি একসময় এখানেও ঘটতে পারে?
অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন শন অ্যান্ড্রুজ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্ভাব্য সংঘাতের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি যদি অ্যাডমিরাল হতাম, তবে আমি মালাক্কা বন্ধ করে দিতাম। সম্ভাব্য যেকোনো সংকটে মালাক্কার নিয়ন্ত্রণ নেওয়াটা অনেকটা গেটকিপার বা পাহারাদারের মতো ভূমিকা পালন করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে কিছু জাহাজকে যেতে দেওয়া হবে, আর কিছু জাহাজকে আটকে দেওয়া হবে।’
এই প্রণালিতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে জাহাজগুলোকে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘ বিকল্প পথ বেছে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে আরও দক্ষিণে গিয়ে লম্বক প্রণালি হয়ে, জাকার্তার কাছে জাভা সাগর দিয়ে অথবা পুরো ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ এড়িয়ে যেতে হবে।
অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো ভৌগোলিক বাধা পেরিয়ে যাওয়ার জন্য এটিই সবচেয়ে দ্রুততম পথ।’তবে মালাক্কা প্রণালি বন্ধ হলে তা হরমুজ সংকটের মতো ততটা ভয়াবহ নাও হতে পারে। কারণ, হরমুজ বন্ধ হওয়ায় অনেক উপসাগরীয় দেশের জন্য খোলা মহাসাগরে যাওয়ার সব পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু মালাক্কা বন্ধ হলে জাহাজগুলোর জন্য বিকল্প পথ রয়েছে। অর্থাৎ, এটি বন্ধ হলে বিশ্ববাণিজ্যে চরম বাধা তৈরি হওয়ার চেয়ে বরং সময় ও খরচ বেশি লাগার মতো ভোগান্তি সৃষ্টি হবে। তবে চীন কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। তাই তারা কয়েক দশক ধরে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ বা মালাক্কার এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে। চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এই প্রণালি দিয়ে আসা অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য জোর দিয়েছিলেন।
কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মেরিটাইম সিকিউরিটি’ বইয়ের লেখক ক্রিশ্চিয়ান বুয়েগার বলেন, হরমুজ সংকটের পর ‘জলপথ নিয়ন্ত্রণের ধরন মৌলিকভাবে বদলে গেছে’। তিনি বলেন, ‘এখন আর বড় বড় গানবোট দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
মালাক্কা প্রণালি-সংলগ্ন তিন দেশ—সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া—দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—উভয়ের সঙ্গেই বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশ্ববাণিজ্যের প্রবাহ নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়েও তারা সব সময় একমত ছিল। কিন্তু হরমুজ সংকটের কারণে এখন সেই সম্পর্কেও কিছুটা উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
ইরানকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া গত মাসে এই প্রণালিতে ‘টোল বুথ’ বসানোর একটি ধারণা দিয়েছিলেন। তবে পরে তার সরকার এই প্রস্তাব থেকে সরে আসে।
গত মাসে সিঙ্গাপুরে সিএনবিসির এক অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরের মন্ত্রী বালাকৃষ্ণান স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের কোনো টোল নেই। আমরা সবাই বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি।’
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান জোর দিয়ে বলেন, আশপাশের সব দেশের অংশগ্রহণ ছাড়া মালাক্কা প্রণালিতে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এটি একটি ‘অকাট্য সমঝোতা’।
গত মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। যৌথ বিবৃতিতে তারা ‘পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে সহযোগিতার অঙ্গীকার’ করেছেন।
হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে হওয়া একগুচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব চুক্তির আওতায় সমন্বিত সামুদ্রিক টহল, আকাশপথে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সেন্টার অন এশিয়া অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের গবেষক বারবোরা ভ্যালোকোভা বলেন, ‘সিঙ্গাপুর এখানে এক ধরনের সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে।’ তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুর অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে ‘হরমুজ থেকে শিক্ষা হলো—মালাক্কাকে সব সময় উন্মুক্ত, বাধাহীন এবং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে আমাদের দ্বিগুণ চেষ্টা করা উচিত।’
সিঙ্গাপুরের মন্ত্রী বালাকৃষ্ণান বলেন, ‘আমেরিকা ও চীন—উভয়কেই আমরা জানিয়ে দিয়েছি যে, আমরা জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন মেনে চলি।’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘ট্রানজিট বা যাতায়াতের অধিকার সবার জন্যই নিশ্চিত করা হয়েছে। এই অঞ্চলে জলপথ বন্ধ করার, বাধা দেওয়ার বা টোল আরোপ করার কোনো চেষ্টায় আমরা অংশ নেব না।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category