নজরুল ইসলাম
পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিধি—সবকিছুর সঙ্গেই পানির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় আজ বিশুদ্ধ পানি যেন দুর্লভ সম্পদ। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী সংস্থা ওসিএইচএ-এর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গাজায় ১৩ লাখের বেশি মানুষ প্রতিদিন পানীয় ও রান্নার জন্য মাথাপিছু ছয় লিটারেরও কম পানি পাচ্ছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে যেখানে একজন মানুষের পানীয়, রান্না ও মৌলিক স্বাস্থ্যবিধির জন্য অন্তত ১৫ লিটার পানি প্রয়োজন, সেখানে এই পরিমাণ পানি মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতাই নির্দেশ করে।
গাজার পানি সংকট নতুন কোনো সমস্যা নয়; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, অবকাঠামো ধ্বংস, জ্বালানি সংকট এবং নিরাপদ পানির উৎসে সীমিত প্রবেশাধিকার পরিস্থিতিকে দিন-দিন ভয়াবহ করে তুলেছে। ইউনিসেফের হিসাবে, গাজার পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ফলে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই চরম সংকটে পড়েছে।
যুদ্ধ কেবল মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অবকাঠামোকেও ধ্বংস করে। গাজার ক্ষেত্রে সেই ধ্বংসের সবচেয়ে নির্মম প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে পানির সংকটে । বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিতে পানি উত্তোলন, শোধন ও সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কোথাও পানি মিললেও তা নিরাপদ কি না, সে নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় পানির সংকট ক্রমেই জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে।
পানি না থাকলে শুধু তৃষ্ণাই বাড়ে না; বাড়ে রোগের ঝুঁকিও। অপর্যাপ্ত পানি ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, গাজার প্রায় ১১ লাখ শিশুর জন্য পানি প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—পানি সংগ্রহও নিরাপদ নয়। যুদ্ধের পরিবেশে ধ্বংসস্তূপ, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং অনিরাপদ সড়ক পানির সন্ধানে বের হওয়া মানুষকে বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে । এমনকি মানবিক সহায়তার আওতায় পানি সরবরাহ করতেও নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গাজায় পানি সরবরাহে মানবিক সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
অথচ পানি কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। যুদ্ধের মধ্যেও বেসামরিক মানুষের জন্য নিরাপদ পানি, খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবিক নীতির অন্যতম মৌলিক দাবি। তাই গাজার পানি সংকটকে কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্বেরও পরীক্ষা বৈকি।
এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। পানি সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি প্রবেশের সুযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত পানির পাম্প ও শোধনাগার মেরামত, নতুন করে পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং নিরাপদ পানি পরিবহনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। মানবিক সহায়তার পথ আরও উন্মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোকে যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রক্ষা করা জরুরি।
গাজায় আজ এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না—এটি একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে, একটি পরিবারের রোগ প্রতিরোধ করতে পারে, একজন মায়ের আতঙ্ক কিছুটা কমাতে পারে। তাই ১৩ লাখ মানুষের পানির সংকটকে সংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখলে চলবে না; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শিশু, একটি মানবিক জীবন।
যুদ্ধের অবসানই গাজার দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মূল সমাধান। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় মানুষের মৌলিক প্রয়োজন থেমে থাকে না। আজই পানি চাই, আজই চিকিৎসা চাই, আজই মানবিক নিরাপত্তা চাই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই আহ্বানে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, তবে গাজার পানির সংকট শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়—মানবতার বিবেকের কাছেও এক দীর্ঘস্থায়ী দায় হয়ে থাকবে।
লেখক: – গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজমনস্ক
nazrulnews1970@gmail.com
তারিখঃ ১৪/৮/২০২৬
( মতামত পাতাটি বাক-স্বাধীনতার প্রতীক। এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও প্রতিটি শব্দকে আমরা সন্মান করি। কারো কারো কাছে লেখা নিয়ে দ্বিমত থাকতেও পারে তবে এর জন্য সম্পাদককে দায়ী করা যাবে না। )