• মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

১০ দফা দাবি নিয়ে ‘গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ’-এর আত্মপ্রকাশ

Reporter Name / ১০৭ Time View
Update : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ১০ দফা দাবি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ’। রবিবার (৩০ আগস্ট) বিকেল ৩টায় রিপোর্টার্স ইউনিয়নের শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১০টি গার্মেন্টস ফেডারেশনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ গঠন করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো হলো- বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্র, সবুজ-বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্টস-সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশন, মাদারল্যান্ড গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেস, বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন, গণতান্ত্রিক গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশে এ খাতে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক কর্মরত, যাদের বড় একটি অংশ নারী। বিপুল এই শ্রমিক জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বর্তমানে তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট, চাকরির অনিশ্চয়তা, শ্রমিক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ, বেতন-বোনাস পরিশোধে অনিয়ম, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে শতাধিক কারখানা বন্ধ ও গণছাঁটাইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য ও জীবনযাপনযোগ্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা, সময়মতো বেতন-বোনাস, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন সংগঠনটির নেতারা।
তারা বলেন, শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই গার্মেন্টস শিল্পকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হবে। মালিক-শ্রমিকের ন্যায্য স্বার্থের সমন্বয়, শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন, সময়মতো মজুরি প্রদান, শ্রম আইন যথাযথ বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
সংবাদ সম্মেলনে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো: ১. অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করতে হবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি পুনর্র্নিধারণ করতে হবে। ২. সব বন্ধ শিল্প-কারখানা চালু করতে হবে এবং অন্যায় ও বেআইনি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। ৩. শ্রমিককে কোনো পর্যায়েই কালো তালিকাভুক্ত করা যাবে না এবং কালো তালিকাভুক্তির নামে শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও অধিকার হরণ বন্ধ করতে হবে। ৪. শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং শ্রমিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ৫. অবিলম্বে প্রয়োজনীয় শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে এবং শ্রম আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ৬. গার্মেন্টস শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উৎপাদন ব্যবস্থা সচল থাকে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হয়। ৭. মাতৃত্বকালীন ছুটি ন্যূনতম ছয় মাস করতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ, সাশ্রয়ী আবাসন, চিকিৎসা, পরিবহন, রেশনিং ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ৯. শ্রমিকদের অবাধে সংগঠিত হওয়া, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন এবং যৌথ দর-কষাকষির অধিকার বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। এ কারণে কোনো ধরনের হয়রানি বা চাকরিচ্যুতি করা যাবে না। ১০. জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিবছর গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে গার্মেন্টস শ্রমিক মঞ্চের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ব্যয় মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার ভাষ্য, অপর্যাপ্ত আয়ের কারণে অনেক শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক ব্যয় কমিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। শিল্পাঞ্চলগুলোতে ক্রমবর্ধমান বাসাভাড়াও শ্রমিক পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি আরো বলেন, ‘মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার।’ শ্রমিক ও তাদের পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে প্রচলিত ‘নূন্যতম মজুরি’-এর পাশাপাশি বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৩৯(৬)-এর উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্ধারিত নিম্নতম মজুরি প্রতি তিন বছর অন্তর পুনর্র্নিধারণের বিধান রয়েছে। ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় এবং ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। তাই বর্তমান বাস্তবতায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্র্নিধারণের প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্প এলাকাগুলোতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করবে গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মঞ্চের যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক ও গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্রের সভাপতি সাহিদা সরকার, যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় গার্মেন্টস-সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. রফিক, বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেসের সভাপতি শামীমা আক্তার, সবুজ-বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন ঠান্ডু, বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাছির, মাদারল্যান্ড গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সান্তনা ইসলাম, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার, গণতান্ত্রিক গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্বাস উদ্দিন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল আহাদ এবং বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সোহেল রানা মিঠুসহ সংগঠনগুলোর নেতারা।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category