প্রভাত সংবাদদাতা, জামালপুর: গ্যাসের সংকটে এবার চরম বিপাকে পড়েছেন জামালপুর শহরে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা। বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হল ও মেসগুলোতেও রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। এতে নিয়মিত খাবার জোগাড় করতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের পানাউল্লাহ আহমেদ হলের প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন জামালপুর শহরের হাজারো পরিবার, সিএনজি চালক ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত অ্যাম্বুলেন্স চালকরা।
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত শহরের একমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন চালকেরা। একই সময় শহরের সিংহভাগ বাসাবাড়িতেও টানা তিনদিন দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে যায়। ফলে খাবার, যাতায়াত ও জরুরি সেবায় তৈরি হয়েছে এক ধরনের নাগরিক সংকট।
গ্যাস না থাকায় বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ হয়ে যায়। কেউ চড়া দামে হোটেল থেকে খাবার কিনেছেন, আবার কেউ এলপিজি ও সিলিন্ডার স্টোভ ব্যবহার করে অতিরিক্ত খরচ সামলানোর চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে জেলার একমাত্র সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ না থাকায় পরিবহন খাতেও দেখা দিয়েছে চরম সংকট।
শহরের গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীদের ওপর। কলেজের পানাউল্লাহ আহমেদ হলে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী থাকেন। সেখানে একসঙ্গে শিক্ষার্থীদের রান্না করা হয়। কিন্তু কয়েকদিন ধরে গ্যাসের সংকটে ঠিকমতো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নিয়মিত খাবার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
হলের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন ছাত্র মেসেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রান্নার ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে অনেককে। এতে বাড়ছে দৈনন্দিন খরচ। আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ।
পানাউল্লাহ আহমেদ হলের শিক্ষার্থী ফয়সাল রানা বলেন, ‘কিছুদিন যাবত বিদ্যুৎ সমস্যা আছে। সেটাও কষ্ট করে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু গ্যাসের সমস্যা কীভাবে মেনে নেব? আমরা হলে তিন বেলা খাই, খাবারের জন্য প্রায় ১০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বাইরে এক বেলাতেই ১০০ টাকা লাগে। আমরা প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত ও গরিব ঘরের সন্তান। এখন খাবারের সমস্যা হচ্ছে। এজন্য অনেকেই আস্তে আস্তে হল ছেড়ে বাসায় চলে যাচ্ছে।’
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, শহরে থেকে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে আবাসিক হল ও মেসের কম খরচের খাবারের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হয়। কিন্তু আর কিছুদিন গ্যাস সংকট চললে বাড়তি খাবারের খরচ বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এতে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতিতে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা ও স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালকরা। রোগী বহনকারী কিংবা জরুরি ট্রিপে থাকা অ্যাম্বুলেন্স পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে।
পাম্পের সামনে অপেক্ষারত অ্যাম্বুলেন্স চালক বাঁধন মিয়া বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে জামালপুরে রোগী নিয়ে আসছি। এখন গাড়িতে যে গ্যাস আছে, তা দিয়ে ফেরত যাওয়া সম্ভব না। গ্যাস পাওয়ার আশায় বৃহস্পতিবার রাতে এখানে আসছি। এরপর থেকে পাম্পের সামনে বসে ও শুয়ে আছি। গ্যাস পেলেতো অতদূর যেতে পারব। গ্যাসই যদি না থাকে, আমরা যাব কীভাবে? মালিক ফোন দিচ্ছে কখন যাব। আমি মালিককে জানিয়েছি, গ্যাস ছাড়াতো আর যেতে পারব না।’
সিএনজি চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে পাম্পটিতে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য সামান্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর গ্যাসের চাপ কমে গেলে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পুরো রাত, সকাল পেরিয়ে শুক্রবার বিকেল হলেও গ্যাসের দেখা মেলেনি। শনিবার ভোর ৪টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি চালক আব্দুল মালেক বলেন, ‘ভোর চারটার সময় বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হইছি। এখনো পাম্পের লাইনে বসে আছি। গাড়ি রাস্তায় রেখে তো আর বাড়িতে যাওয়া যাবে না। দুপুর হয়ে গেল, এক টাকাও আয় করতে পারলাম না। উল্টো দেড়শ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমাদের মতো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের তো আর কিছু করার নেই।’
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জামালপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ম্যানেজার দুর্জয় খকসী বলেন, ‘মূল সরবরাহ লাইনে কোনো গ্যাস না থাকায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। জামালপুর জেলায় তিতাস গ্যাসের মাসিক চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনমিটার।’