• বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন
Headline
ফানুস ওড়ানোয় বিশেষ নজরদারি, বৌদ্ধদের দুই উৎসবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে খুলনায় এবার ৮১৮টি মন্দিরে পূজা-অর্চনার আয়োজন ব্যালন ডি’অরে নতুন ভোটে মেসির চেয়ে এগিয়ে রোনালদো! ইমরান-পুত্রদের সাক্ষাৎকারের জের, ধারাভাষ্য থেকে বাদ ইংল্যান্ডের দুই কিংবদন্তি! এমিলিয়ানো মার্টিনেজের শারীরিক অবস্থার উন্নতির খবরে স্বস্তি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পূজার উপহার দিলেন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী- ডিএসসিসি প্রশাসক আবারও গ্রেপ্তার ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগারওয়ালা সরকারি চাকরিজীবীরা এ মাসেই বাড়তি বেতন পাবেন, আগের হারে ভাতা দেয়া হবে চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচন শেষ করা কঠিন : ইসি মাছউদ বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে: দীনেশ ত্রিবেদী

ট্রাম্প-শি বৈঠক: ‘ডন তজু’ বনাম ‘দার্শনিক রাজা’: বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক দর্শন

Reporter Name / ১৩০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬
চীনের রাজধানী বেইজিং–এর গ্রেট হল অব দ্য পিপলে রাষ্ট্রীয় সফরে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। (ছবি তুলেছেন ডিং লিন)

প্রভাত ডেস্ক: চীনে গত এপ্রিল মাসে ‘ডন তজু’ নামে একটি বিশেষ মিম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রাচীন চীনা সামরিক কৌশলবিদ সান জু–এর নাম মিলিয়ে তৈরি একটি শব্দ। এই মিমের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্টকে এমন এক ‘কৌশলগত গুরু’ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে যার প্রজ্ঞা কোনো ব্যাকরণ বা যুক্তির তোয়াক্কা করে না।
মিমটিতে সান জু’র লেখা ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ বইতে থাকা কিছু দার্শনিক বাক্যজুড়ে দিয়ে ট্রাম্পীয় ঢঙে ‘জয়ের দর্শন’ তুলে ধরা হয়েছিল। যেমন—‘শত্রুর অবরোধ ভাঙতে হলে তার অবরোধকেই অবরোধ করো’, ‘তুমি যদি নিজেই না জানো তুমি কী করছো, তোমার শত্রুও তা জানবে না’ এবং ‘তোমার কোনো লক্ষ্য না থাকলে তুমি হারবেও না।’
মিমটি জনপ্রিয় হওয়ার কারণ ছিল এটি ট্রাম্পের ক্ষমতা ব্যবহারের একটি বাস্তব দিককে ধরতে পেরেছিল। তিনি প্রচলিত অর্থে কৌশল চর্চা করেন না। তিনি কোনো সুস্পষ্ট নীতি, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নির্ধারিত লক্ষ্য মানেন না। খোলাখুলিভাবে বললে, তার বিশেষত্ব হচ্ছে- বিশৃঙ্খলাকেই প্রভাব তৈরির অস্ত্রে পরিণত করা। তিনি এত বেশি শব্দ ও নাটকীয়তা তৈরি করেন যে, অন্য সবাই বাধ্য হয় তার প্রতিটি পদক্ষেপের অর্থ খুঁজতে।
ট্রাম্প যুদ্ধের আগেই বিজয় ঘোষণা করেন! যুদ্ধ চলাকালেও করেন! যুদ্ধের পরও নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা দেন। আবার কখনো কখনো যুদ্ধের পরিবর্তে শুধু ঘোষণাই দেন। ট্রাম্পীয় জগতে ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে কোনো মিল নেই, আছে বাস্তবতাকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা।
এখানেই পার্থক্য গড়ে তুলেছেন ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ গণচীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ট্রাম্প যদি হন ‘ডন তজু’ তবে শি জিনপিং যেন ‘দার্শনিক রাজা’। ট্রাম্প মনে করেন, ‘নিয়ম বলে কিছু নেই, আছে শুধু জয়।’ আর শি বলেন, ‘নিয়ম আছে এবং সেগুলো চীন বহু আগেই লিখে রেখেছে।’

প্লেটোর ‘দার্শনিক রাজা’ মতবাদ

এই মতবাদটি গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর। তার ‘রিপাবলিক’ (Republic) গ্রন্থে বর্ণিত একটি বিখ্যাত রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো ‘ফিলোসফার কিং’ বা ‘দার্শনিক রাজা’। তার মতে, রাষ্ট্র তখনই ন্যায়পরায়ণ ও সুশৃঙ্খল হতে পারে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জ্ঞানী, স্বার্থহীন ও সর্বোচ্চ নৈতিক গুণসম্পন্ন দার্শনিকদের হাতে ন্যস্ত থাকবে।
একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পর্দার আড়ালে শি এমন একজন নেতা যার দেশের অভ্যন্তরে কার্যত কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তিনি দুর্বল নেতাদের উপদেশ দেন এবং নিজেকে এমন প্রাচীন চীনা শাসকদের ধারাবাহিকতায় দেখেন যারা রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সভ্যতাগত শিক্ষা ও নৈতিক কর্তৃত্বও মিলিয়ে নিয়েছিলেন।
ট্রাম্পকে ‘ডন তজু’ বলে তাচ্ছিল্য করার কারণ তিনি কৌশলকে অর্থহীনতায় রূপ দেন। আর শি জিনপিং অন্যদের বিশৃঙ্খলাকেই নিজের গাম্ভীর্যের প্রমাণে পরিণত করেন। ট্রাম্প এমনভাবে রাজনীতিতে চলেন যেন তিনি ঘরে ঢুকেছেন বলেই ঘরটির অস্তিত্ব হয়েছে। শি জিনপিং এমনভাবে চলেন যেন ঘরটি পাঁচ হাজার বছর ধরে বিদ্যমান এবং অন্য সবাই শুধু সঠিক সম্বোধন শেখার অপেক্ষায়।
ট্রাম্পের দর্শনকে ‘দর্শনের অনুপস্থিতি’ মনে করা হয়। কিন্তু যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চর্চা করলে অনুপস্থিতিও এক ধরনের পদ্ধতিতে পরিণত হতে পারে। তার কাছে প্রতিটি সমস্যা একটি চুক্তি, প্রতিটি চুক্তি একটি প্রদর্শনী, প্রতিটি প্রদর্শনীতে একজন বিজয়ী দরকার-আর সেই বিজয়ী হবেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এ কারণেই ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটা এমন এক ক্যাসিনোর মতো, যেখানে একই ব্যক্তি সঞ্চালক, নিরাপত্তারক্ষী এবং বের হওয়ার পথে স্মারক স্টেক বিক্রেতা। তার কাছে জোট মানে বকেয়া বিল, বাণিজ্য ঘাটতি মানে অপমান, আর শীর্ষ বৈঠক মানে টেলিভিশনে প্রচারণায় পুরুষালি প্রতিযোগিতা।
তবে ট্রাম্পের অসংলগ্নতা রাজনৈতিকভাবে কার্যকর কারণ এটি সবাইকে ক্লান্ত করে ফেলতে পারে। মিত্র, প্রতিপক্ষ, বাজার, আমলা, সেনাবাহিনী ও সাংবাদিকরা তার বক্তব্যের মানে খুঁজতেই সব শক্তি ব্যয় করে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পকে খুব তাড়াতাড়ি বুঝে ফেলেছিলেন শি জিনপিং। কিন্তু সে বোঝার ধরনে আছে পার্থক্য, যা প্রশংসার যোগ্য নয়। প্রথমবার নির্বাচনে ট্রাম্প জয় পাওয়ার পর বিস্মিত হয়েছিলেন শি জিনপিং। আমেরিকান ভোটাররা এমন একজন অপ্রচলিত মানুষকে বেছে নিতে পারে বলে অবাক হয়েছিলেন শি।
অর্থনৈতিক হতাশা ও চাকরি হারানোর ক্ষোভ ট্রাম্পের উত্থানের কারণ বলে এক বৈঠকে শি জিনপিংকে জানিয়েছিলেন বারাক ওবামা। ওবামার ওই কথায় শি জিনপিং নাকি কলম নামিয়ে হাত গুটিয়ে বলেছিলেন-‘যদি একজন অপরিণত নেতা বিশ্বকে বিশৃঙ্খলায় ফেলে, তবে বিশ্ব জানবে কাকে দোষ দিতে হবে।’
শি’র এই মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, শি জিনপিংয়ের দৃষ্টিতে ট্রাম্প শুধু একজন ব্যক্তি নন বরং আমেরিকান গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতার প্রতীক। তার কাছে ট্রাম্পের উত্থান প্রমাণ করে যে উদারপন্থি গণতন্ত্র আর ‘অগুরুত্বপূর্ণ’ মানুষদের ঠেকাতে পারছে না।
শি’র রাজনৈতিক দর্শন ঠিক বিপরীত ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তিনি চীনকে শুধু আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে নয় বরং হাজার বছরের সভ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা সাময়িক দুর্বলতা কাটিয়ে আবার তার ‘যথাযথ অবস্থানে’ ফিরে আসছে।
মধ্যম শক্তিগুলোর প্রতিও ট্রাম্প ও শি-এর আচরণে বড় পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রায়ই মিত্রদেরও আমেরিকান ক্ষোভের কেন্দ্রে আনতে বাধ্য করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য। ডেনমার্কের সার্বভৌম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছেন ট্রাম্প, যা ছিল এক ধরনের আধিপত্য প্রদর্শনের মঞ্চ।
এদিক থেকে শি আলাদা। তিনি প্রকাশ্য নাটক চান না বরং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, আনুষ্ঠানিকতা ও শৃঙ্খলা গুরুত্ব দেন। ২০২২ সালে জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে তার উত্তপ্ত কথোপকথন সেটির উদাহরণ। সেখানে শি স্পষ্ট করে দেন-চীনের সঙ্গে কথা বলার ‘সঠিক ঘর’ ও ‘সঠিক ভঙ্গি’ আছে।
গণতন্ত্র সম্পর্কেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। ট্রাম্পের কাছে গণতন্ত্র বৈধ তখনই যখন এটি তাকে সমর্থন করে। শির কাছে গণতন্ত্র অনেকটা জাদুঘরের প্রদর্শনীর মতো-সম্মানজনক হলেও ২১শ শতাব্দীর দ্রুতগতির বাস্তবতার জন্য খুব ধীর।
তাদের পররাষ্ট্রনীতিও সেই স্বভাবের প্রতিফলন। ট্রাম্প চান দ্রুত চুক্তি, দৃশ্যমান সাফল্য ও করতালি। শি চান দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন-বিশেষত চীনের মর্যাদা ও ‘রেড লাইন’ মেনে নেওয়া।
সহজভাবে দেখলে ট্রাম্প ও শি যেন বিপরীত চরিত্রের মানুষ—‘একজন বিশৃঙ্খল, অন্যজন শৃঙ্খল’। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে দুজনই একই বৈশ্বিক সংকটের ভিন্ন উত্তর। বিশ্বমঞ্চে তাদের উত্থান এমন এক সময়ে হয়েছে যখন পুরোনো উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মানুষের আস্থা হারাচ্ছে।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category