• শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৩:৫২ অপরাহ্ন
Headline
ভারতের ‘ভোজশালা’কে মসজিদ নয়, মন্দির স্বীকৃতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ওয়াশিংটনে সংলাপ : যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৪৫ দিন বাড়াল ইসরায়েল-লেবানন ইরানে সমন্বিত হামলা চালাতে আরব দেশগুলোকে উদ্বুদ্ধ করেছিল আমিরাত নাইজেরিয়ায় আইএসের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ নিহত ট্রাম্প-সি বৈঠক: ইরান-তাইওয়ান নিয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা নেই বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২০০ উড়োজাহাজ কিনছে চীন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের যৌথ পরিকল্পনার দাবির পর বিপাকে ওমান দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের তামাক ব্যবহার , প্রায় দুই লাখ মৃত্যু বাজারে সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ব্রয়লারের কেজি ২০০, ডিমের ডজন ১৫০ সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত : ডিসিসিআই

দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের তামাক ব্যবহার , প্রায় দুই লাখ মৃত্যু

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে দেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়। এটি দেশে বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ। ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভাল্যুশনের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে মৃত্যুর প্রায় ৭৯ শতাংশ ঘটে প্রত্যক্ষ ধূমপানের কারণে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে—৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ভারতে এ হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বের ১৬২টি দেশের মধ্যে কম দামি সিগারেটের সহজলভ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। অর্থাৎ বাংলাদেশে সিগারেট এখনো তুলনামূলক সস্তা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে খোলা চিনির দাম বেড়েছে ৮৯ শতাংশ, আলু ৮৭ শতাংশ, আটা ৭৫ শতাংশ, ডিম ৪৩ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৩৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ১৫ শতাংশ। গবেষকেরা বলছেন, এর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ ও তরুণদের সিগারেটের পেছনে অর্থ ব্যয় সহজ হচ্ছে।
বাংলাদেশের সিগারেট বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নিম্নস্তরের সিগারেটের বিস্তারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৬–০৭ অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেটের বাজার অংশীদারত্ব ছিল ২৫ শতাংশ। ২০২৩–২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ বাজার এখন ক্রমেই সস্তা সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। গবেষকদের মতে, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের দামের ব্যবধান কম হওয়ায় কোম্পানিগুলো নতুন নতুন ব্র্যান্ড এনে কম দামের সিগারেটের বাজার সম্প্রসারণ করেছে। তামাক কোম্পানিগুলো প্রায়ই দাবি করে, তারা দেশের সবচেয়ে বড় করদাতা। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, এই দাবির বড় অংশ বিভ্রান্তিকর।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তামাক কোম্পানিগুলো মূলত ভোক্তার কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেয়। যেমন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ২০২৪ সালে ৩৪ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা কর দিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ ছিল প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশই ভোক্তার দেওয়া পরোক্ষ কর। অর্থাৎ সিগারেট কিনছেন যে মানুষ, কর মূলত তিনিই দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, তামাকে খরচ হওয়া অর্থ যদি অন্য পণ্য, শিক্ষা, পুষ্টি বা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হতো, তাহলে সেই অর্থও অর্থনীতিতে অবদান রাখত এবং সরকার সেখান থেকেও রাজস্ব পেত।
তামাক কোম্পানিগুলোর আরেকটি যুক্তি হলো—কর বাড়ালে চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্য বাড়বে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের এক গবেষণা বলছে, ২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সিগারেটের অবৈধ বাণিজ্য সবচেয়ে কম—মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। সে তুলনায় ভারতে এটি ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৮ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৩৬ শতাংশ। গবেষকেরা বলছেন, অবৈধ বাণিজ্য মূলত প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়, কর বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।
তামাকবিরোধী সংগঠন ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব হলো—নিম্ন ও মধ্যমস্তরের সিগারেট একত্র করে ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা করা, উচ্চস্তরের দাম ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ২০০ টাকা করা, প্রতি প্যাকেটে নির্দিষ্ট ৪ টাকা কর আরোপ, সব স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা।
গবেষকদের দাবি, এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবেন, ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবেন, দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।
তামাক কর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা চালু আছে—কর বাড়ালে রাজস্ব কমবে। অথচ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে উল্টোটা।
বাংলাদেশে যে সিগারেট সস্তা, সে কথা সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানও স্বীকার করেন। গত ২৭ এপ্রিল এক প্রাক্‌–বাজেট আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, ‘এত কম দামে আমাদের আশপাশের কোনো দেশে সিগারেট পাওয়া যায় না।’
বাংলাদেশে কম দামের সিগারেটকে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলেছে। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর বড় কারণ, দেশের তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতা। বছরের পর বছর এমন এক করব্যবস্থা বহাল আছে, যেখানে কাগজে করহার বেশি দেখালেও বাস্তবে সিগারেটের দাম তুলনামূলক কমই থেকে যাচ্ছে। এর সুযোগ নিচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে দেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়। এটি দেশে বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ। ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভাল্যুশনের তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে মৃত্যুর প্রায় ৭৯ শতাংশ ঘটে প্রত্যক্ষ ধূমপানের কারণে।
কিন্তু অর্থনীতির হিসাব আরও ভয়াবহ। ‘ইকোনমিক কস্টস অব টোব্যাকো ইন বাংলাদেশ: অ্যান আপডেটেড এস্টিমেট ইনক্লুডিং হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ড্যামেজেস’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি।
বাংলাদেশে তামাক কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, সিগারেটে ইতিমধ্যেই অনেক বেশি কর রয়েছে। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, সমস্যা করের হারে নয়, সমস্যা কর কাঠামোয়।
বর্তমানে দেশে সিগারেটে চারটি মূল্যস্তর রয়েছে—নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম। প্রতিটি স্তরে আলাদা দাম ও করহার। এই বহুস্তর কাঠামোর ফলে ভোক্তারা সহজেই এক স্তর থেকে আরেক স্তরে চলে যেতে পারেন। ফলে দাম বাড়লেও ধূমপান পুরোপুরি কমে না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য গবেষকেরা।
গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের তামাক করব্যবস্থা ‘অত্যন্ত জটিল’ এবং এটি তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিচ্ছে। বলা হয়, তামাকে কর বাড়ালে রাজস্ব কমবে। অথচ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে উল্টোটা। ফিলিপাইনে ২০১২ সালে তামাক কর সংস্কারের পর কয়েক বছরের মধ্যে সিগারেট ব্যবহার কমেছে, আবার রাজস্বও বেড়েছে কয়েক গুণ। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শাফিউন এন শিমুল তাঁর এক উপস্থাপনায় দেখিয়েছেন, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে পরিবারপ্রতি আয় বেড়েছে ১০৩ শতাংশ, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম সেই হারে বাড়েনি।
গবেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সিগারেটের দাম সেই হারে বাড়েনি। ফলে বাস্তবে সিগারেট আরও ‘সস্তা’ হয়ে গেছে।
ফিলিপাইনে ২০১২ সালে তামাক কর সংস্কারের পর কয়েক বছরের মধ্যে সিগারেট ব্যবহার কমেছে, আবার রাজস্বও বেড়েছে কয়েক গুণ। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
অধ্যাপক শাফিউন এন শিমুল গণমাধ্যমকে বলেন, কার্যকর তামাক কর একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য রক্ষা, রাজস্ব বৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে সিগারেটের ওপর কর বাড়িয়ে তুললে রাজস্ব আয় কমতে কমতে অন্তত ৮ থেকে ১০ বছর লাগতে পারে। এর মধ্যে দেশের অনেক ভিন্ন আয়ের উৎস তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু তরুণেরা নিরুৎসাহিত হলে দেশের বিরাট একটি সম্পদ বাঁচবে।
বাংলাদেশ এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। যে পণ্য বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে, সেটিই এখনো এত সহজে কেনা যায় যে একজন তরুণের কাছে তা মোবাইল ডেটার চেয়েও সস্তা মনে হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি এখনো তামাককে শুধু রাজস্বের উৎস হিসেবেই দেখবে, নাকি এটিকে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করবে?
দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে। সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যেই ধূমপানের অভ্যাস শুরু হয় বলে জানান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধূমপায়ী করে তোলার নানা আয়োজন আছে। কিন্তু সরকার তো ব্যবসা করার জন্য নয়। সরকার মানুষের সেবা করার জন্য। কিন্তু রাজস্বের অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্রের মানুষের এমন স্বাস্থ্যগত ক্ষতি যেভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে, তা কাম্য নয়।
তামাকের ওপর কর আরোপ নিয়ে তামাক কোম্পানি ও তামাকবিরোধীদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখা যায়। কোম্পানিগুলো রাজস্ব কমে যাওয়ার ভয় দেখায়। আর বিরোধীরা কর আরোপ আরও বেশি করতে বলে।
অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, দুই পক্ষের এই ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেও একটা সামঞ্জস্য দরকার। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, তামাকের ওপর কর আরোপের বিষয়টির সঙ্গে নৈতিকতা, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রাধান্যের তালিকায় থাকা উচিত।

সূত্র : প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category