প্রভাত রিপোর্ট: যুক্তরাজ্যের আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হলে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব। এ লক্ষ্য অর্জনে পণ্যের বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, সনদায়ন প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণ এবং শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা। বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি: তৈরি পোশাক ছাড়া অন্যান্য খাতের সম্ভাবনা’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর ঢাকা চেম্বার অডিটোরিয়ামে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর। এ নির্ভরশীলতা কমিয়ে ঔষধ, খাদ্য ও হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, কৃষিপণ্য, বাইসাইকেল, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিকসহ সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতের রপ্তানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রবর্তিত ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের (ডিসিটিএস) সুবিধা কাজে লাগাতে রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক রয়েছে। তবে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির সিংহভাগ তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, সনদায়ন, পণ্যের উৎস ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অনুসরণযোগ্যতা, প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আরও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের বাজারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণেও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ডিসিটিএসের আওতায় যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশাধিকারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উদ্যোক্তাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা নিরসন প্রয়োজন।
বাংলাদেশস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরও যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ কাজে লাগাতে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিদ্যমান সুযোগগুলো কাজে লাগাতে এগিয়ে আসবেন।
মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপনকালে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৪.৬৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল প্রায় ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মোট আমদানির পরিমাণ ৯৪৮ বিলিয়ন ডলার হলেও দেশটির আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০.৪৯ শতাংশ। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ১ শতাংশে উন্নীত করা গেলে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি।
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে ঔষধ, খাদ্য ও হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, কৃষিপণ্য, বাইসাইকেল, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি পণ্যের মূল্য সংযোজন ও ভ্যালুচেইন ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষা ও সনদায়ন সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং যুক্তরাজ্যের বাজারের নীতিমালা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও নিবিড় ধারণা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আরিফ বলেন, রপ্তানি খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে শুধু একটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এ জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সুবিধা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কর্মশালায় যুক্তরাজ্যের ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের ওপর একটি কারিগরি অধিবেশন পরিচালনা করেন বাংলাদেশস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের বাণিজ্য উন্নয়নবিষয়ক আঞ্চলিক উপদেষ্টা এলি পার্কার। অধিবেশনে ডিসিটিএসের আওতায় বর্তমান ও এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ, অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা গ্রহণের পদ্ধতি এবং বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে রপ্তানিকারকদের করণীয় তুলে ধরা হয়।
আলোচনা পর্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম, হরটেক্স ফাউন্ডেশনের পরিচালক খুরশিদ আহমদ ফারহাদ, মেঘনা গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাক আহমেদ তানভীর, কাপকেক এক্সপোর্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির ওবায়েদ, এম. ইউ. সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস এবং বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীরসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা ও নতুন বাজারের সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য এসব উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মশালায় বাংলাদেশের অপ্রচলিত বা নন-আরএমজি রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে উভয় পক্ষের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে ডিসিসিআইয়ের সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, ইপিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।