আরাফাত দাড়িয়া
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একদিকে প্রশংসিত হয়েছে, অন্যদিকে তীব্র খাবার সংকট, আবাসন সমস্যা প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার জীবন-জীবিকার চাপ বাংলাদেশ তীব্রভাবে অনুভব করছে। এটি এখন কেবল বাংলাদেশেরই সমস্যা নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জও বটে। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে শুরু থেকেই বাংলাদেশ বলে আসছে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, তাদের নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার আবেদনও করেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তিনটি শর্ত যথা নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন না হলে রোহিঙ্গারা ফিরবে না, কিংবা বাংলাদেশ জোরপূর্বক তাদের ফেরত পাঠাতে পারবে না বলে বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কোন উদ্যেগ নিতে পারেনি। রোহিঙ্গারা চায় মিয়ানমার সরকার তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক।
এ ব্যাপারে অবশ্য বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সমুন্নত রাখা এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ইকোসক হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স সেগমেন্টে উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় তিনি এ আহ্বান জানান। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ্য করা হয়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, সংঘাত প্রতিরোধে অধিক বিনিয়োগ এবং মানবিক, শান্তি ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রতিমন্ত্রী রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের সহায়তায় চলমান অর্থায়ন সংকটের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান।
মূলত ২০১৭ সালের ব্যাপক অনুপ্রবেশের পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং চীনের মধ্যস্থতায় কয়েকবার ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হলেও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ওআইসির উদ্যোগে কয়েকবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রত্যাবাসন প্রস্তাব গৃহীত হলেও মিয়ানমার এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি।
২০১৬ সালের শেষ ভাগ থেকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর কয়েক মাস ধরে সহিংসতা চালায়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, আগে থেকেই বৈষম্যের শিকার এ জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর তীব্রতর হয়। রোহিঙ্গা জনপদে অগ্নিসংযোগ, নির্বিচারে গুলি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনী এবং উগ্রবাদীদের হামলায় প্রায় ১০ হাজার লোক নিহত হয়। ওই সময় জীবন বাঁচাতে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে গত শতাব্দীর নব্বই দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকারের গণহত্যা ও নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে আরো তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে এসে অবস্থান করেছিল। ওই সময় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ফেরত পাঠানো গেলেও অনেকেই আশ্রয় শিবিরে থেকে যায়।
সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার দেশ শাসনভার গ্রহণের পর প্রায় দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকারে নিতে হবে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আগামী জাতিসংঘ অধিবেশনে আলোচনার টেবিলে রোহিঙ্গা সমস্যা থাকবে বলে ধারণা করছেন অনেকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকেও এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।