• সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন
Headline
পাম্পে কমছে না গাড়ির দীর্ঘ সারি, তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে চালকেরা বাজারে অস্বস্তি, মূল্যস্ফীতিতে ‘স্বস্তি’ খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের ধরলো পুলিশ দেশে আরও ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী যুদ্ধের কারণেই জ্বালানি সংকট, সরকার দায়ী নয়: রিজভী কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদার, তদন্তে সিটিটিসি সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান নতুন তথ্যমন্ত্রীর সততা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কার্যক্রম শুরু প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন নীতিমালা প্রণয়ন হবে: শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী

ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: জিইডির প্রতিবেদন

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্বশাসনকে আইনিভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যেকোনো সংস্কারে বাধা আসে, এটিও এ খাতের আরেকটি বড় ঝুঁকি। বিশেষ করে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে এমন বাধা আসে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। জিইডির প্রতিবেদনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে ব্যাংক খাতের সর্বোচ্চ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সংস্কার ও উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন খাতে আগামী পাঁচ বছরে কী করা উচিত, সেই কৌশল ও নীতি আছে।
জিইডির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ঢিলেঢালা ভূমিকা ও যাচাই-বাছাই ছাড়া সুবিধাজনক ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতির কারণে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে।
ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রবল—এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক বিবেচনা বা প্রভাবে ঋণ দেওয়া, নিয়োগ, খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন, ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নামে–বেনামে ঋণের নামে লুটপাট করেছেন—এমন অভিযোগও আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি ব্যাংক খাত। সমস্যাগ্রস্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আমানতকারীরা এখন জমানো টাকা পেতে সমস্যায় পড়ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ খেলাপি ঋণ আদায়, তদারকি জোরদার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে জিইডির ওই প্রতিবেদনে পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কৌশলগত রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ (এনপিএল), দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রভাবশালী ও রাজনীতিঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার মতো নানা জটিলতায় জর্জর। এসবের প্রভাবে ব্যাংকগুলোর মূলধন ক্ষয় ও মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০৩১ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে জিইডির ওই প্রতিবেদনে। তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ শতাংশে কমিয়ে আনতে চায় সরকার।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিন ধাপে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে প্রথম বছরে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষতি প্রশমন করা হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতি বা ব্যালেন্স শিট পুনর্গঠন করা হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে এ খাতের কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে সংস্কার করে পুনর্গঠন করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে ব্যাংক খাত ঠিক করতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি যারা ব্যাংক খাতকে এ অবস্থায় নিয়ে গেছে, তাদের বিচার করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ অনিয়মে যুক্ত না হয়।’
মোস্তফা কে মুজেরী আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি ঠিক করতে হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে হবে। পাশাপাশি পেশাদারত্বের ভিত্তিতে ব্যাংক খাত চালাতে দিতে হবে। তাহলে ব্যাংকগুলো আবার অর্থায়ন শুরু করবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে; যা এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি।
প্রথম বছরে ক্ষতি সামাল দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক চিহ্নিত করে আমানতকারী ও সম্পদের সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে এবং সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে কঠোর তদারকিতে রাখা হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের (উইলফুল ডিফল্টার) দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নতুন করে যেন খেলাপি ঋণ তৈরি না হয়, সে জন্য ঋণখেলাপি ও নিরাপত্তাসঞ্চিতিতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হবে প্রথম বছরে। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ বা যোগ্য ও উপযুক্ত নীতি নেওয়া হবে। এমনকি ব্যর্থ বা অনিয়মে জড়ানো পর্ষদ পুনর্গঠনের কথাও বলা হয়েছে জিইডির প্রতিবেদনে। আমানত সুরক্ষা তহবিল কার্যকর করার পাশাপাশি একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মূলধন শক্তিশালী করা এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমানতের টাকা ফেরতের তাৎক্ষণিক পথনকশা তৈরি করা হবে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর হলো পুনর্গঠন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বছর। ওই দুই বছরে আর্থিক খাতের ভিত্তি মজবুত ও ঋণ আদায় তদারকি জোরদার করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনগত স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গ করার পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির অংশ হিসেবে কঠোর ‘স্ট্রেস টেস্টিং’ চালু হবে। নজরদারি বাড়ানো হবে বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর। পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং একই পরিবারের পরিচালকের সংখ্যা ও মেয়াদের ওপর বিধিনিষেধ দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে।
চূড়ান্ত ধাপে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জোরদার হবে। শেষ দুই বছরে পুরো ব্যাংকিং–ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে আইনি ও প্রবিধানগত পরিবর্তন আনা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আইন সংশোধন ও তথ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি অটোমেটেড করা হবে।
জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি ও প্রবিধানসংক্রান্ত সংস্কারগুলো সরাসরি পরিচালনা করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি সংশোধনের কাজটি সমন্বয় করবে।
প্রস্তাবিত এই সংস্কারের গতি ও ফলাফল পরিমাপ করা হবে মূলধনের পর্যাপ্ততা, তারল্য, সম্পদের গুণগত মান এবং আমানতকারীদের আস্থার সূচক দিয়ে। প্রতিবছর সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে এবং ২০২৮ অর্থবছরে গিয়ে একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন (মিড-টার্ম রিভিউ) পরিচালনা করা হবে।
জিইডির কৌশলগত নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, শুধু ঋণ বাড়িয়ে বর্তমান সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করতে হলে রাইট-অফ (ঋণ অবলোপন) এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে আগে আর্থিক স্থিতি বা ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে হবে। এতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমলে তারা পরবর্তীতে এসএমই, কৃষি ও শিল্প খাতের মতো উৎপাদনশীল জায়গায় নিরাপদে ঋণ দিতে পারবে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category