• মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৩ অপরাহ্ন
Headline
বিমানবন্দরে গিয়ে নারী জানতে পারেন, তাঁর ভিসায় আরেকজন ইতালি চলে গেছেন আটক রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিদায়ী নৌ-প্রধানের সাক্ষাৎ প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য বিমান টিকিটসহ বিশেষ সুবিধা যুক্ত করা হবে : বিমান মন্ত্রী শিশুদের প্রযুক্তি থেকে দূরে নয়, সঠিক ব্যবহার শেখাতে হবে: ববি হাজ্জাজ মধ্যস্থতায় মামলা ৬২% কমেছে, এক বছরে বিচার বিভাগে আশার আলো দেখা যাবে : আইনমন্ত্রী ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত বাংলাদেশের কাজে অসন্তুষ্ট হলে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ আনতে পারেন প্রধানমন্ত্রী: তথ্য উপদেষ্টা সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমের হজ প্যাকেজ ঘোষণা, সর্বনিম্ন প্যাকেজ ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা যে কারনে ভাইরাল বিটিএস তারকা জিমিন

ভ্যাট আদায়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবচিত্র অত্যন্ত হতাশার

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: ভোক্তা পর্যায়ে ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে গত দেড় দশক ধরে নানামুখী চেষ্টা চালিয়ে আসছে এনবিআর। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রথমবার ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রকল্পটি শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে। এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সংযোগ না থাকা, মাঠপর্যায়ের তদারকির অভাব, অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ এবং ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে ইসিআর ভ্যাট আদায়ের চেয়ে ফাঁকি বাড়াতেই বেশি সহায়ক হয়।
ভ্যাট আদায়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবচিত্র অত্যন্ত হতাশার। খুচরা ও পাইকারি খাতের ৭৫ লাখ ব্যবসায়ী থেকে বছরে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট— যা সম্ভাব্য রাজস্বের মাত্র ৩ শতাংশ! মূলত ইএফডি যন্ত্র বন্ধ রাখা, ‘প্যারালাল বিলিং’ বা নকল রসিদ প্রদান এবং তদারকির অভাবে সাধারণ ভোক্তারা শতভাগ ভ্যাট পরিশোধ করলেও তার ৯৭ শতাংশই বেহাত হয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তা, অন্যদিকে এনবিআরের খাতায় প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে বিশাল রাজস্ব ঘাটতির ব্যর্থতা।
রাজস্ব ব্যবস্থা অটোমেশনের লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) এবং পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) প্রকল্পের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও কোনো সুফল মেলেনি। প্রযুক্তির অপব্যবহার, দক্ষ জনবলের অভাব, এনবিআরের শিথিল তদারকি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে শপিংমল, চেইন শপ ও রেস্তোরাঁ থেকে ভ্যাট আদায় বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কাস্টমস শুল্কের প্রভাব কমে আসায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে ভ্যাটের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রাজস্বে ভ্যাটের অবদান ২৫ শতাংশের বেশি হলেও, দেড় দশকের ব্যর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দুর্নীতির কারণে পরোক্ষ কর হিসেবে এটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইএফডির মতো প্রকল্প রাজস্ব আদায়ে সফল হলেও বাংলাদেশে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এর পেছনে মূল কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে— ইএফডি যন্ত্রের মানগত ত্রুটি, মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকির ঘাটতি, ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়ের অনীহা এবং করদাতা, কাস্টমস ও ভ্যাট সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে সমন্বিত কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম না থাকা।
সরেজমিনে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, বসুন্ধরা সিটি, মৌচাক ও বেইলি রোডের শপিংমলগুলোতে দেখা গেছে, কিছু দোকানে ইএফডি যন্ত্র থাকলেও ব্যবসায়ীরা তা ব্যবহার না করে অকার্যকরভাবে ফেলে রেখেছেন।
ইসিআরের ব্যর্থতার পর ২০১৮ সালে এনবিআর ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ও সেলস ডাটা কন্ট্রোলার (এসডিসি) চালুর উদ্যোগ নেয়। শুরুতে প্রতিটি যন্ত্র ২০ হাজার ৫৩৩ টাকায় ব্যবসায়ীদের নিজ খরচে কেনার বাধ্যবাধকতা দিলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। পরবর্তীতে বিনামূল্যে বা সহজ কিস্তিতে সরবরাহের ঘোষণা দিলেও চার বছরে মাত্র ১০ হাজার মেশিন বসানো সম্ভব হয়।
পরিস্থিতি সামলাতে ২০২২ সালের নভেম্বরে বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড’-এর সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি করে এনবিআর। শর্তানুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ২৫ ধরনের ব্যবসায় তিন লাখ ইএফডি মেশিন সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি, যার লক্ষ্য ছিল বছরে গড়ে ২১২ কোটি টাকা গ্রস রাজস্ব অর্জন। তবে, বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও পৌঁছানো যায়নি।
দেশের ভ্যাট ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও পেপারলেস করার লক্ষ্যে বিগত দেড় দশকে নানামুখী স্বয়ংক্রিয়করণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৪৭ কোটি টাকা। অটোমেশন উদ্যোগের অংশ হিসেবে চীনভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এসজেডজেডটি (SZZT) থেকে প্রথম ধাপে ১০ হাজার ইএফডি ও এসডিসি মেশিন আমদানি করা হয়, যেখানে ব্যয় হয় প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা। তবে কারিগরি ত্রুটি, যন্ত্রের নিম্নমান ও মাঠপর্যায়ে যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে এর অধিকাংশই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিসের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, পাঁচ বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন লাখ মেশিন সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে প্রাক্কলিত প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় প্রায় হাজার কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী জেনেক্সকে সরাসরি কোনো সরকারি তহবিল দেয়া হবে না; বরং তারা সংগৃহীত ভ্যাটের ওপর প্রাপ্ত ০.৫৩ শতাংশ কমিশন পাবে। তবে, মাঠপর্যায়ের স্থবিরতা ও দ্বিপাক্ষিক বিরোধের কারণে কোম্পানির ব্যয় করা ৯৪ কোটি টাকার পাওনা নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে তীব্র টানাপোড়েন চলছে বলে জানা গেছে।
ইএফডি ডিভাইস স্থাপনের প্রথম লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ বছরে তিন লাখ, অর্থাৎ বছরে ৬০ হাজার। অথচ দুই বছরে স্থাপিত হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৩১৩ থেকে ১৫ হাজার ৯৯৫টি। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বছরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার মেশিন স্থাপন। কিন্তু দুই বছর পার হওয়ার পরও জেনেক্স ইনফোসিস মাত্র ১১ হাজার ৩১৩টি ডিভাইস স্থাপন করতে পেরেছে, যা বার্ষিক ৬০ হাজার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
অন্যদিকে, ২০২০ সালে ইএফডি বসানোর উদ্বোধনের পর থেকে এনবিআর কিংবা জেনেক্স সবমিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার ৭৪১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি ও এসডিসি মেশিন স্থাপন করেছে। তবে, এর মধ্যে কারিগরি ত্রুটি ও ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহের কারণে মাঠপর্যায়ে অধিকাংশ যন্ত্রই বর্তমানে অকার্যকর বা বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে পুরো ভ্যাট অটোমেশন প্রক্রিয়াটি বর্তমানে এক গভীর অচলাবস্থায় নিমজ্জিত।
নতুন ভ্যাট আইন চালু হওয়ার পর এনবিআরের স্বয়ংক্রিয় ও অনলাইনভিত্তিক কর ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগকে জনপ্রিয় করতে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে ইএফডি লটারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে মোট ১০১ জন বিজয়ীর জন্য ইএফডি লটারির আয়োজন করা হয়। ইএফডি রসিদকে লটারি কুপন বিবেচনা করে প্রতি মাসেই নিয়মিত এর আয়োজন করা হতো।
সবমিলিয়ে ২৪টির মতো ইএফডি লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হলেও এটি ক্রেতাদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সাড়া ফেলতে পারেনি। লটারি কার্যক্রমটি সুফল না আনায় অবশেষে তা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিজয়ীদের খুঁজে না পাওয়ার বিড়ম্বনা এবং পর্যাপ্ত জনসচেতনতার অভাবকে এর জন্য দায়ী করেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, লটারির টিকিটে (ভ্যাট চালান) ক্রেতার সঠিক নাম বা যোগাযোগের নম্বর না থাকা, কেনাকাটার সময় ইএফডি চালান না নেওয়া, সঠিক চালান নম্বর সিস্টেমে এন্ট্রি না হওয়া কিংবা লটারি জিতলেও পুরস্কারের টাকা সংগ্রহের জটিল প্রক্রিয়ার কারণেই এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং সাধারণ ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, যেসব প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন বসানো রয়েছে, সেগুলোর একটি বড় অংশই অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা হয়। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বেইলি রোড ও উত্তরার মতো বাণিজ্যিক জোনের বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ ও সুপারশপগুলোতে সরেজমিনে এমন চিত্রই মিলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘সার্ভার ডাউন’, ‘ইন্টারনেট সংযোগ নেই’, ‘মেশিন বিকল’ কিংবা ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাট’-এর মতো সাধারণ অজুহাত দেখানো হয়। এছাড়া, ক্রেতাদের মধ্যেও ইএফডি রসিদ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখা যায়।
শান্তিনগর, খিলগাঁও ও বেইলি রোড এলাকার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় হাতে লেখা কাগজে বা সাধারণ কম্পিউটারে প্রিন্ট করা বিলে পেমেন্ট নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে, যেখানে মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের কোনো সুযোগ রাখা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা বিলও নেন না। অর্থাৎ ক্রেতার পকেট থেকে ভ্যাটের টাকা ঠিকই নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তার কোনো বৈধ ডিজিটাল ইএফডি রসিদ দেওয়া হচ্ছে না।
বেইলি রোডের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অনেক দোকানেই ইএফডি মেশিন রয়েছে, কিন্তু সব সময় ব্যবহার করা হয় না। অনেক ক্রেতা রসিদ নিতে চান না, আবার বিক্রেতারও ভয় রয়েছে। তাই অনেক ব্যবসায়ী এখনও যন্ত্রটি নিয়মিত ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। সেক্ষেত্রে আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই চলতে হয়।’
বাংলাদেশে এক দশক ধরে ইএফডি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিতে না পারলেও, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের প্রকল্পে ব্যাপক সাফল্য মিলেছে। রুয়ান্ডা, পর্তুগাল, এস্তোনিয়াসহ কয়েকটি দেশ ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ে অনন্য নজির গড়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়ন বলছে, বাংলাদেশে কর প্রশাসনে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, সমন্বিত করদাতা তথ্যভাণ্ডার এবং কার্যকর ডিজিটাল সংযুক্তির ঘাটতির কারণেই এই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি।
বার্সেলোনা স্কুল অব ইকোনমিক্সের ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, কেবল ইএফডি বসালেই কর আদায় বাড়ে না; যদি না সেটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লায়েন্স বা মনিটরিং কৌশলের অংশ করা হয়। রুয়ান্ডা, পর্তুগাল, কেনিয়া কিংবা তানজানিয়া ভ্যাট আদায় বাড়াতে শুধু ইএফডি ব্যবহারের ওপর নির্ভর করেনি; বরং তার সঙ্গে সুশাসন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং ক্রেতাদের জন্য সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা যুক্ত করেছিল।
২০১৩-১৪ সাল থেকে রুয়ান্ডা বাধ্যতামূলকভাবে ইএফডির মতো ইলেকট্রনিক বিলিং মেশিন (ইবিএম) চালু করে। আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত কর সংস্কারে রুয়ান্ডাকে রোল মডেল ধরা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ইবিএম বসানোর এক দশকে দেশটিতে ভ্যাট রাজস্ব আদায় ২০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ২৫৯ বিলিয়ন রুয়ান্ডান ফ্রাংক থেকে ৭৯২ বিলিয়ন ফ্রাংকে উন্নীত হয়েছে। ই-ইনভয়েসিং, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠানোর ফলেই এ সাফল্য এসেছে।
এছাড়া, পর্তুগালও তাদের ই-ইনভয়েসিং প্ল্যাটফর্ম ‘ই-ফাতুরা’ -এর মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধে বৈপ্লবিক সাফল্য দেখিয়েছে। পর্তুগালে কেনাকাটার পর ক্রেতারা কর আইডি দিয়ে বিল নিলে তাদের বার্ষিক আয়কর ছাড় দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রতিটি বৈধ রসিদের বিপরীতে ছিল আকর্ষণীয় ‘লাকি লটারি’। এ ধরনের পুরস্কার ও কর ছাড়ের ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা ভ্যাট ফাঁকি দিতে বাধ্য হয়ে সরে এসেছেন।
তবে, কেনিয়া ২০০৫ সালে ও তানজানিয়া ২০১০ সালে ইএফডি প্রযুক্তি চালু করলেও শুরুর দিকে বাংলাদেশের মতোই ধাক্কা খেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কঠোর আইন প্রয়োগ, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ইএফডিকে সামগ্রিক কমপ্লায়েন্স কৌশলের আওতায় এনে তারা ধীরে ধীরে পরিস্থিতির চিত্র বদলে ফেলে।
অন্যদিকে, উগান্ডাকেও কর ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক রোল মডেল ধরা হয়, যেখানে ভ্যাট আদায়ে ১৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইউএনইউ-ওয়াইডার এবং আইসিটিডি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উগান্ডা শুধু দোকানে মেশিন বসানোর ওপর নির্ভর করেনি; তারা প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, ই-ইনভয়েসিং এবং কঠোর আইনি প্রয়োগের সমন্বয় ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশে এই উদ্যোগ কেন ব্যর্থ হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, “বিদেশ থেকে শিক্ষা না নেওয়া এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবই এই প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। যেসব দেশে এমন প্রযুক্তি সফল হয়েছে, তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার এবং সিস্টেমের ‘ইন্টার-অপারেবিলিটি’ নিশ্চিত করে ভালো ফলাফল পেয়েছে।”‘অটোমেশন প্রকল্পের সফলতার জন্য প্রযুক্তির চেয়েও বেশি জরুরি হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। যেকোনো নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রাথমিক শর্ত হওয়া উচিত। কেবল প্রযুক্তি বা ই-ইনভয়েসিং যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি সামগ্রিক রূপরেখা বা কমপ্রিহেনসিভ ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সদস্য) ইএফডি সিস্টেমের প্রধান ব্যর্থতার কারণ হিসেবে যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকে (ডিভাইস ডিপেন্ডেন্সি) দায়ী করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শুরুতেই খরচ, সহজলভ্যতা এবং সেবার ক্ষেত্রে টেকসই ব্যবস্থার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। যখন কোনো দোকানে ইএফডি বা ই-ইনভয়েস সুবিধা থাকে না, তখন বিকল্প ব্যবস্থার অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ইএফডি সিস্টেমের জটিলতা এড়াতে অনেকে ই-ইনভয়েস এড়িয়ে গেছেন এবং কাগজের ভাউচার দিয়েছেন। আসলে ই-ইনভয়েস এবং এআই ক্যামেরার সমন্বয় একটি কার্যকরী সমাধান হতে পারত। এআই ক্যামেরা দিয়ে গ্রাহকদের তথ্য সংগ্রহ এবং লেনদেনের সারাংশ তৈরি করা সম্ভব, যা ম্যানুয়াল ডাটা এন্ট্রির ভুল এবং দুর্নীতি অনেকাংশে কমিয়ে আনত।’
অপারেটরদের কমিশন হার অত্যন্ত কম থাকা। কাজের অতিরিক্ত চাপ, দক্ষ জনবল নিয়োগ না হওয়া ও তাদের স্বল্প বেতন— কোনো কিছুই অনুকূল ছিল না। কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান জেনেক্সের মূল এজেন্ডা ইএফডি ছিলই না, তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়েছে। সিস্টেমকে আরও কার্যকর করতে ই-ইনভয়েস এবং এআই ক্যামেরার ব্যবহারের পাশাপাশি ডেটা স্ট্রাকচার ও ভ্যাট মডিউলের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা জরুরি’— যোগ করেন তিনি।
খুচরা বাজারে ভ্যাট ফাঁকির আরেকটি ভয়ংকর প্রতারণার নাম ‘প্যারালাল বিলিং’ জালিয়াতি সিন্ডিকেট। অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব পয়েন্ট অব সেলস (পস) বা হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যারকে এমনভাবে প্রোগ্রামিং করে নিয়েছে, যা হুবহু এনবিআরের ইএফডি রসিদের মতো দেখতে ভুয়া বা নকল রসিদ প্রিন্ট করতে পারে। এসব নকল রসিদে ভ্যাটের হার, পণ্যের বিবরণ এবং ট্যাক্সের পরিমাণ লেখা থাকলেও নিচে এনবিআরের অনন্য আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা রিয়েল-টাইম কিউআর কোড থাকে না। ক্রেতারা সরল বিশ্বাসে ভ্যাট পরিশোধ করলেও পুরো টাকাটাই চলে যায় বিক্রেতার পকেটে।
এনবিআরের ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অভিযানে বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের এই প্যারালাল বিলিং ও রাজস্ব চুরির ভয়াবহ চিত্রের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিগত পাঁচ বছরে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানের নথি যাচাই করে ১,৫৮৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উদঘাটন করেছেন ভ্যাট গোয়েন্দারা।
ভ্যাট আইনের ধারা বা বিধিমালার অধীনে নিয়মিত ঝটিকা অভিযান পরিচালনা এবং আকস্মিক অডিট করার সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা ভ্যাট কমিশনারেটগুলোর রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এই তদারকি ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭৫ লাখের বেশি ব্যবসায়ী রয়েছেন। যদি প্রতিটি দোকান থেকে গড়ে মাসে মাত্র ২০ হাজার টাকাও ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হতো, তবে এই খাত থেকে বার্ষিক এক লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা যেত।
অথচ এনবিআরের পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে মাঠপর্যায় থেকে মাত্র পাঁচ হাজার কোটি টাকার মতো ভ্যাট আদায় হয়, যা মোট সম্ভাব্য ভ্যাট সংগ্রহের মাত্র ৩ শতাংশ! অর্থাৎ খুচরা ও পাইকারি বাজারের প্রায় ৯৭ শতাংশ ভ্যাটই সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। অথচ ভোক্তারা যখন কোনো রেস্তোরাঁ বা চেইন শপে কেনাকাটা করছেন, তখন তারা কষ্টার্জিত অর্থ থেকে কর দিলেও তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না হওয়াকে আমানতের চরম খেয়ানত ও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এনবিআরের অটোমেশনের আওতায় চালু হওয়া ইএফডি প্রকল্পটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। প্রকল্পের পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও তা কোনো সুফল আনতে পারেনি।’ তিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমালোচনা করে বলেন, ‘আমাদের দেশের আমলারা কোনো বিষয়ে কারও সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না এবং তারা এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন। অথচ প্রযুক্তিগত কাজ বা অটোমেশনের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ দিয়ে ইএফডি ও ভ্যাট সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।’
এনবিআরের ২০২৩ সালের এক আদেশ অনুযায়ী, ইএফডি ব্যবহার না করলে বা ক্রেতাকে রসিদ না দিলে সর্বোচ্চ আর্থিক জরিমানার পরিমাণ মাত্র ১০ হাজার টাকা। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া বড় বড় রেস্তোরাঁ ও ব্র্যান্ড শপের কাছে এই সামান্য জরিমানা এক প্রকার প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়। অথচ ভ্যাট আইন অনুযায়ী কর ফাঁকির সমপরিমাণ (৫০% থেকে ১০০%) জরিমানা আদায়ের কঠোর বিধান থাকলেও মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি ও যোগসাজশের কারণে তার প্রয়োগ দেখা যায় না।
কর বিশেষজ্ঞ ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া খুচরা পর্যায়ে উচ্চ ভ্যাট হার ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘খুচরা পর্যায়ে বেশি ভ্যাটের হার অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা ইএফডি এড়িয়ে নগদ (ক্যাশ) লেনদেনেই বেশি আগ্রহী থাকেন। ইএফডি প্রবর্তনের সময় আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) যুক্ত করার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি ছিল। এনবিআরের অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় ইসিআর ও পরবর্তীতে ইএফডি প্রবর্তনের মূল লক্ষ্য ছিল বিক্রয় তথ্য স্বচ্ছ করা এবং কর আদায় বৃদ্ধি করা। তবে, বড় বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সত্ত্বেও ইএফডি ব্যবস্থাটি আশানুরূপ সফলতার মুখ দেখেনি।’
ই-ইনভয়েসিং ও ইএফডিএমএস-এর পার্থক্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘ইনভয়েসিং মূলত বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য, যেখানে নির্দিষ্ট টার্নওভারের প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট মনিটরিং করা হয়। ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইএফডিএমএস) সেই পর্যায়ের কার্যকর সক্ষমতা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিক্রেতারা অনেক সময় ১০০টি বিক্রির মধ্যে মাত্র ৬০টি ইনভয়েস ইএফডির মাধ্যমে দেন, আর বাকি ৪০টি ইনভয়েসিং ছাড়াই সম্পন্ন করেন। এআই প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না থাকায় এনবিআর এই ফাঁকিগুলো ধরতে পারছে না।’
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও ইএফডি ব্যর্থ হওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ইসিআর থেকে বর্তমানের ইএফডি পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পগুলো কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার কারণ এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অস্পষ্টতা। মাঠপর্যায়ের অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাবই এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং এর সঠিক বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category