প্রভাত রিপোর্ট: দেশে হাম ও হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। শনিবার (২৩ মে) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। শুক্রবার (২২ মে) সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের হাম-সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। নতুন মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে একজন নিশ্চিত হামে মারা গেছে। বাকি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৮৬ জনের প্রাণ গেছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে প্রাণহানির সংখ্যা ৪২৬। এছাড়া, ১৫ মার্চের পর থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে আট হাজার ৪৯৪ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৬২ হাজার ৫০৭। উল্লেখিত সময়ে হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ জনকে এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৪৫ হাজার ১১ জন।
আর কয়েকদিন পরেই আসছে ঈদুল আজহা। এই ঈদকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই বাড়বে ঘরমুখো মানুষের ব্যাপক যাতায়াত। ঈদ উদযাপনে পরিবারের সদস্যরা সংস্পর্শে আসবে একে অপরের। তবে একে অপরের এই কাছে আসাতেই হাম রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে বলে মনে করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব। এরপরে বাড়তে রোগীর সংখ্যা। একইসাথে বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যাও। এরপরে কিছুটা তুলনামূলক কিছুটা কমতে শুরু করে রোগীর সংখ্যা। আবার যারা আসেন তারাও জরুরি চিকিৎসা নিয়ে চলে যেতে পেরেছেন বাড়িতে। তবে এখন আবার বাড়ছে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের হাম বিভাগে দায়িত্বরতরা।
হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেছে কিনা জানতে চাইলে দায়িত্বরত নার্স বলেন, আমাদের এখানে সারাক্ষণই রোগী আসতে থাকে। আমার দেখা অনুযায়ী বলতে পারি যে রোগী আগের তুলনায় আসা কমেছে, এটা আমার দেখা অনুযায়ী বলছি। তবে রোগী কমলেও খারাপের অবস্থাটা বেড়েছে। আগে দেখা যেত যে অনেক রোগী এসেছে আমরা তাদের ইমার্জেন্সিতে দেখে বাসায় ট্রিটমেন্ট করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি। এরকম হয়েছে। কিন্তু এখন যেটা হয়েছে যে এডমিশন লাগেই।
এসময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জরুরী বিভাগে কর্মরত এক চিকিৎসক গণমাধ্যমকে বলেন, এখন হামের ফ্লো বেড়ে গিয়েছে। এটা ঈদের পরে আরও বাড়বে। কারন তারা বাড়িতে যাবে অনেকের সাথে সংস্পর্শে আসবে। তখন এটা আরও বেড়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ঈদের সময় আমাদের সবার ডিউটি থাকবে। এটা মূলত রোস্টার আকারে থাকবে।
হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পরে শ্যামলীর এই শিশু হাসপাতালে দুইটি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হতো। পাশাপাশি ছিলো আইসিইউ। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারনে নতুন আরেকটি ওয়ার্ড হামের চিকিৎসায় যুক্ত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে ওয়ার্ড বাড়ানোর পরেও অনেক রোগীকেই ফিরে যাচ্ছে সিট না পেয়ে। এই হাসপাতালে হামের চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, আগে আমাদের হামের রোগী রাখা হতো দুইটি ওয়ার্ডে। এখন রোগী বাড়াতে এবং যেহেতু এটা সংক্রামক রোগ তাই আরেকটি ওয়ার্ড খালি করে সেখানেও হামে আক্রান্ত রোগী রাখা হচ্ছে।
হামে আক্রান্ত হওয়া সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে বাবা-মায়েরা। চলছে চিকিৎসা। কিন্তু তবুও অভিভাবকদের মনে থেকেই যাচ্ছে আতংক। কবে সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন আছেন সেই অপেক্ষায়। তবে আসছে ঈদের ছুটিতে এই আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আরও বেড়ে যাওয়া আশংকা করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ফলে এই ছুটিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ঈদের ছুটিতে হামের সতর্কতা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ঈদের ছুটিতে বিশাল সংখ্যক মানুষ স্থানান্তরিত হবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এদের মধ্যে যাদের শরীরে হামের জীবাণু রয়েছে এবং যাদের জ্বর হওয়ার একদিন দুদিন পার হয়েছে তারা কিন্তু অন্যদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে। কারণ হামের ফুসকুরি ওঠার চারদিন আগে এবং চারদিন পর পর্যন্ত এটি জীবাণু ছড়ায় ভাইরাস ছড়ায়। ফলে আমরা আশঙ্কা করছি ঈদ যাত্রার মধ্য দিয়ে হামের ভাইরাস আরো একটু বেশি ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ঈদের পরে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি আরেকটি সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ কারণে আমরা সবাইকে বলব যাদের পরিবারের কোন একজন অথবা একাধিক কারো জ্বর থাকে তাহলে তাদের উচিত করে অপেক্ষা করা; সেটি হামে রূপান্তরিত হয় কিনা সেটি লক্ষ্য করা এবং একই সাথে চিকিৎসা ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।