প্রভাত অর্থনীতি: যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রপ্তানি কমলেও সেই বাজার বড় পরিসরে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। শুল্ক-সংক্রান্ত জটিলতায় দেশটিতে চীনের রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমলেও সেই ক্রয়াদেশের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার কাছে। সাম্প্রতিক মার্কিন আমদানির তথ্য ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।
অফিস অভ টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল-এর (ওটেক্সা) প্রকাশিত তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে পারস্পরিক শুল্ক আরোপের প্রভাবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। এই তিন মাসে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৩৮ শতাংশ কমেছে।
কেবল বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারকের মধ্যে ৮টি দেশেরই রপ্তানি কমেছে এই সময়ে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, চীন ও ভারতের রপ্তানি যেখানে যথাক্রমে ৫৩ শতাংশ ও ২৭ শতাংশ কমেছে, সেখানে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া তাদের রপ্তানি যথাক্রমে ২.৭৭ শতাংশ ও ১৮ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য রপ্তানিকারকদের তুলনায় চীন ও ভারতের ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি হারে শুল্ক আরোপ হওয়ায় দেশ দুটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমছে। কিন্তু দেশ দুটির হারানো বাজার বাংলাদেশ তেমন দখল করতে পারছে না। বরং চীনের ছেড়ে দেওয়া বাজারের বড় একটি অংশ দখল করে নিচ্ছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সহসভাপতি শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, চীন ম্যান-মেইড ফাইবারের (কৃত্রিম তন্তু) পোশাকে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের বাইরে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়াও এতে ভালো করছে এবং সেখানে চীনেরও বিনিয়োগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু বাড়তি শুল্কের কারণে চীন পারছে না, সেজন্য ওই ক্রয়াদেশ আলোচ্য দেশগুলোতে যাচ্ছে। এজন্য চীনের ছেড়ে দেওয়া বাজারের অংশ বাংলাদেশ নিতে পারছে না।’
পোশাক শিল্প গবেষক এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, চীনের কাঁচামালের সহায়তায় তাদের ছেড়ে দেওয়া অংশ দখল করছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো।
ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ১৭.৭৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাকপণ্য আমদানি করেছে, অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই পতন সত্ত্বেও ৩৯.৮৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে মার্কিন বাজারে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম।
অন্যদিকে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চীনকে টপকে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২০.৩৭ বিলিয়ন ডলারে, আর চীনের রপ্তানি কমে ১৬.৯৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। মার্কিন বাজারে শীর্ষ রপ্তানিকারকদের তালিকায় এর পরেই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাস।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী রপ্তানিতে গতি আসার সম্ভাবনা কম। তবে জুনের পর থেকে গতি আসবে বলে আশাবাদী তারা।
শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, জুলাইয়ের পরের মাসগুলো থেকে রপ্তানিতে গতি আসতে পারে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রপ্তানিকারকরা আশা করছেন, এই সময়ের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি হবে। অন্যদিকে মার্কিন পাল্টা শুল্কের একটা স্থায়ী সমাধান আসতে পারে। ফলে চাহিদা বাড়তে পারে।
এদিকে, ১০ শতাংশ শুল্কের বিরুদ্ধে আদালতের একটি রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন আপিল করায় মার্কিন পাল্টা শুল্ক ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত ৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত শুল্ক চ্যালেঞ্জ করা তিনটি কোম্পানির পক্ষে রায় দেয়। তবে রপ্তানিকারকরা জানান, এই রায়টি বর্তমানে শুধু ওই মামলা-সংশ্লিষ্ট তিন বাদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প প্রশাসন পরের দিনই (৮ মে) এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। এর ফলে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর থাকবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আদালত শুল্ক আদায় পুরোপুরি স্থগিত করেনি; আর এই রায়টি কেবল স্বতন্ত্র তিন বাদীর যুক্তির ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৬ সালের ৮ মে সেকশন ১২২-সংক্রান্ত আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। প্রশাসনের আপিল গ্রহণ করা হলে আমদানিকারকরা ১০ শতাংশ শুল্ক ফেরত পাবে না। অন্যদিকে আপিল খারিজ হলে ওই আমদানিকারকরা রিফান্ডের আবেদন করতে পারবেন। এখন যারা আবেদন করছেন বা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হবে।’