• শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন
Headline
‘“ডোনাল্ড ট্রাম্প” কোরবানি হচ্ছে বাংলাদেশে’, টেলিগ্রাফের খবর কখনো মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কখনো প্রভাবশালীর আত্মীয় পরিচয়ে প্রতারণা, দুজন গ্রেপ্তার পেট্রলপাম্পের ওয়াশরুমে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ফারিনের মুক্তির আগেই দৃশ্য ফাঁস, নতুন ঝামেলায় শাহরুখের ‘কিং’ মালয়ালম সিনেমা ‘দৃশ্যম ৩’,প্রথম দিনেই আয় করল প্রায় ৪৩ কোটি রুপি ওটিটিতে ‘দম’–এর দর্শকসংখ্যা আরও বেড়েছে ‘টক্সিক: আ ফেয়ারি টেল ফর গ্রোন-আপস’-এর মুক্তির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত কিয়ারা আদভানি তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র কোন দেশে কেমন শাস্তি পায় ধর্ষক ভারতের মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনটি প্রধান ‍বিষয়ে বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

শিল্পায়ন ও নগরায়ণ এবং যৌথ পরিবারের ভাঙন

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬


…………………….. সাদমনি আল অনন্য…………………………..

মানবসভ্যতার ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব এবং তার পরবর্তী নগরায়ণ প্রক্রিয়া সমাজব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তনের ঢেউ সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে সমাজের আদি ও মৌলিক প্রতিষ্ঠান, ‘পরিবার’-এর ওপর। শিল্পায়নের ফলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ভেঙে পড়ে এবং কলকারখানানির্ভর অর্থনীতি গড়ে ওঠে। কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে মানুষ শহরে ভিড় জমায়, যার ফলে দ্রুত নগরায়ণ ঘটে। এই দুই প্রক্রিয়ার প্রভাবে প্রথাগত যৌথ পরিবারের কাঠামো ভেঙে গিয়ে আধুনিক একক বা অণু পরিবারের উদ্ভব ঘটে।
‘পরিবার’ শুরু হওয়ার ইতিহাস অনেকটা আপেক্ষিক; খুঁজে বের করার কাজটাও খানিকটা জটিল। পরিবারের উৎপত্তি সম্পর্কে চারপাশের সংস্কৃতি থেকে যে ধারণা পাওয়া যায়, তাতে পরিবারের বয়স কোটি বছরেরও বেশি। জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক এঙ্গেলস মনে করেন, পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং রাষ্ট্র মানবজীবনের চিরন্তন কোনো অংশ নয়। অর্থনীতির বিকাশের একটা পর্যায়ে গিয়ে এসবের উদ্ভব ঘটেছে এবং অর্থনীতির প্রয়োজনেই এগুলোর বিলুপ্তি কিংবা পরিবর্তন ঘটতে পারে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পশ্চিম ইউরোপে ‘পরিবার’ নিয়ে ইতিহাস ঘেঁটে দেখার সমাজতাত্ত্বিক আগ্রহ ছিল প্রবল। ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে পশ্চিমা বিশ্বে বাইবেলের লেখাকেই পরিবারের উৎপত্তি হিসেবে মানা হতো। বাইবেলের পারিবারিক রূপ এবং পিতৃতান্ত্রিক আদর্শিক অনুশাসনগুলো অনুসরণ করা হতো। যেমন—পরিবারে পুরুষ, নারী ও শিশুদের ভূমিকা বাইবেল অনুসারেই নির্ধারণ করা হতো।
ঐতিহাসিকরা সাধারণত বিয়ে বা রক্তের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে একটা আত্মীয়তা বর্ণনা করতে ‘পরিবার’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। পারিবারিক কাঠামোর ক্ষেত্রে বেশি ভাগ নৃতাত্ত্বিক বিশ্বাস করেন, আনুমানিক সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে একেকটি পরিবারের গড় সদস্য ছিল ৩০ জনের মতো। এদের মধ্যে কয়েক জন থাকতেন নেতার ভূমিকায়, যাদের সবাই পুরুষ। এসব নেতা শারীরিক সম্পর্কের জন্য পরিবারের নারীদের নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতেন। শিশুদের দায়িত্বও ভাগ করা থাকত। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়— খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৩৫০ সালে মেসোপটেমিয়ায় প্রথম ‘নথিভুক্ত বিয়ের’ অনুষ্ঠানের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তী কয়েক শ বছর ধরে প্রাচীন হিব্রু, গ্রিক ও রোমানদের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানের ব্যাপক চল ছিল।
শিল্পায়ন ও নগরায়ণের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো—যৌথ পরিবারের ভাঙন। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে যৌথ পরিবার ছিল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, কারণ সেখানে পরিবারের সবাই মিলে জমিতে কাজ করতেন। কিন্তু শিল্পায়নে কাজের জন্য মানুষকে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হয়। শহরের ছোট বাসায় বা সীমিত আয়ে বিশাল যৌথ পরিবার নিয়ে থাকা সম্ভব হয় না। ফলে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ছোট বা একক পরিবার ( Nuclear Family) গড়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়াটি পরিবারের আকার ছোট করে দিয়েছে এবং আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল করেছে।
শিল্পায়ন নারীদের ঘরের চার দেওয়াল থেকে বের করে এনেছে। কলকারখানা, অফিস ও বিভিন্ন সেবা খাতে নারীদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নগরায়ণের ফলে নারীরা শিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এর ফলে পরিবারে নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতা বেড়েছে। আগে যেখানে নারীরা কেবল গৃহস্থালি কাজ করতেন, এখন তারা পরিবারের আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছেন। এটি পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের কঠোরতা কমিয়ে দিয়েছে।
একক পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর ওপর মানসিক চাপ বেশি থাকে। যৌথ পরিবারের মতো এখানে সমস্যা সমাধানের জন্য মুরুব্বিরা থাকেন না। এছাড়া নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ বাড়ার কারণে আপস করার মানসিকতা কমেছে। ফলে শহুরে সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পারিবারিক কলহ, ডিভোর্স এবং সিংগেল প্যারেন্টিং (একক অভিভাবকত্ব) এখন নগরায়ণের সাধারণ চিত্র।
শিল্পায়িত সমাজে প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। যৌথ পরিবারে বৃদ্ধরা ছিলেন পরিবারের কর্তা ও শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু একক পরিবারে তাদের ‘বোঝা’ মনে করা হয়। সন্তানরা কাজের জন্য দূরে থাকে কিংবা বিদেশে চলে যায়, ফলে বৃদ্ধ বাবা-মা নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। গ্রামেও এখন বৃদ্ধাশ্রম বা ‘ওল্ড হোম’ তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে, যা আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পরিপন্থি।
শহরে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী হলে সন্তানের দেখাশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। যৌথ পরিবারের দাদা-দাদি না থাকায় শিশুদের কাজের লোকের কাছে বা ডে-কেয়ার সেন্টারে বড় হতে হয়। এর ফলে শিশুর সঠিক সামাজিকীকরণ ব্যাহত হয়। নগরায়ণের ফলে মানুষ যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। ‘সময় নেই’, এই অজুহাতে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া বা খোঁজ নেওয়া কমে গেছে। আগে বিয়ে বা উৎসবে আত্মীয়রা দিনের পর দিন একসঙ্গে থাকত, এখন তা কয়েক ঘণ্টার আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। রক্তের সম্পর্কের চেয়ে পেশাগত সম্পর্ক বা বন্ধুত্বের গুরুত্ব শহরে বেশি। আত্মীয়তার বাঁধন আলগা হয়ে যাওয়ায় বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর লোক কমে গেছে।
গ্রামের তুলনায় শহরে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার প্রবণতা কম। শিল্পায়ন ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রভাবে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ বা ইহজাগতিক হয়ে উঠছে। পরিবারের মাধ্যমে যে ধর্মীয় শিক্ষা বা নৈতিকতা শেখানো হতো, তা এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। লিভ-ইন রিলেশনশিপ বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো নৈতিকতার সংজ্ঞা পালটাচ্ছে।
শিল্পায়ন পরিবারের ক্ষমতাকাঠামোতে গুণগত পরিবর্তন এনেছে। আগে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে গল্প করা, পুঁথি পড়া বা ইনডোর গেমস খেলা ছিল বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু নগরায়ণের ফলে বিনোদন বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। সিনেমা হল, পার্ক, শপিং মল বা রেস্তোরাঁয় খাওয়া এখন বিনোদনের অংশ। এছাড়া ঘরে থেকেও সবাই যার যার মোবাইল বা ল্যাপটপে ব্যস্ত থাকে। পারিবারিক আড্ডা হারিয়ে যাচ্ছে। শহুরে পরিবেশে শিক্ষার সুযোগ বেশি থাকায় পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। তারা চায় সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত হয়ে ভালো ক্যারিয়ার গড়ুক। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টির ব্যাপারেও আধুনিক পরিবারগুলো সতর্ক। ছোট পরিবার সুখী পরিবার, এই ধারণা গ্রহণ করে তারা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করে। ফলে পরিবারের আকার ছোট এবং মানসম্মত হচ্ছে।
মানসিক চাপ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ আধুনিক মানুষের নিত্যসঙ্গী। নগরায়ণ মানুষকে ভিড়ের মধ্যে একা করে দিয়েছে। ফ্ল্যাট কালচারে পাশের বাসায় কে থাকে, তা-ও অনেকে জানে না। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation) এবং কর্মক্ষেত্রের তীব্র প্রতিযোগিতা মানুষের মনে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। দিন শেষে পরিবারই একমাত্র আশ্রয় হলেও, সেখানেও সময়ের অভাবে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। ফলে বিষণ্ণতা ও মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে।
শিল্পায়ন ও নগরায়ণ পরিবারের সনাতন কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে, কিন্তু পরিবারের প্রয়োজনীয়তাকে শেষ করতে পারেনি। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হওয়া, নারীর ক্ষমতায়ন বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ এগুলো ইতিবাচক দিক। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদ, প্রবীণদের অবহেলা এবং শিশুদের একাকিত্ব, এগুলো নেতিবাচক ও উদ্বেগজনক দিক। আধুনিক যুগ পরিবারের কাছে নতুন নতুন দাবি পেশ করছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখা এবং মানবিক মূল্যবোধ চর্চা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, দিনশেষে পরিবারই মানুষের শেষ ঠিকানা।
১৯৮০ সালে জাতিসংঘ পরিবার-সম্পর্কিত ১৯ বিষয়সমূহের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে শুরু করে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ১৯৮৩ সালে সামাজিক উন্নয়ন কমিশনের ১৯৮৩/২৩ নম্বর রেজুলেশনের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবারের গুরুত্বের ওপর সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মহাসচিবের সহযোগিতা কামনা করা হয়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ২৯ মে, ১৯৮৫ তারিখের রেজুলেশন ‘উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবার’ নামে সাধারণ অধিবেশনের ৪৪ নম্বর সেশনে একটি সাময়িক আলোচনার প্রস্তাব আনা হয়। এতে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি অনুরোধ করা হয়, যেন বিষয়টি সরকার, আন্তঃসরকার, এনজিও এবং সর্বস্তরের জনগণের কাছে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়।
জাতিসংঘ অর্থনৈতিক সামাজিক পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ও অনুরোধের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালের ৯ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদের রেজুলেশনের মাধ্যমে ১৯৯৪ সালকে আন্তর্জাতিক পরিবার বর্ষ ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালন করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৩ সালের সাধারণ পরিষদে রেজুলেশন গৃহীত হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালনের উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বশান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে পরিবারের গুরুত্ব তুলে ধরতে সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, র‍্যালি জাতীয় নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

লেখক : গবেষক ও -ভাবচিন্তক

( মতামত পাতাটি বাক-স্বাধীনতার প্রতীক। এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও প্রতিটি শব্দকে আমরা সন্মান করি। কারো কারো কাছে লেখা নিয়ে দ্বিমত থাকতেও পারে তবে এর জন্য সম্পাদককে দায়ী করা যাবে না। )


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category