প্রভাত সংবাদদাতা, রাঙামাটি: সাজেক সড়কে টানা অবরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল। এর মধ্যে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছিল আন্দোলনকারীরা। তবে অবরোধ শিথিলের দিনেই পাল্টা সড়ক অবরোধের ডাক দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি ও কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে সাজেক খাগড়াছড়ি সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালক ও শ্রমিকরা।
এতে অবরোধ শিথিল হলেও নতুন কর্মসূচির কারণে সড়কে যানচলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সাজেক সড়কে অবরোধ শিথিল থাকার কথা রয়েছে। তবে একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি ও বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন পরিবহন চালক ও শ্রমিকরা।
অবরোধের সময় শ্রমিকরা খাগড়াছড়ি সদরের মাস্টার দোকান, দীঘিনালা, সুপারি বাগান ও কবাখালীসহ বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলে এবং টায়ার জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব বিন্দু লাল চাকমা এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে খাগড়াছড়ি সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি।
সরজমিনে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাজেক সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালক ও শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু কয়েক দিন পরপর বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় নিয়মিত যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। এতে কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়ায় তাদের আর্থিক সংকট দেখা দেওয়ায় তারা পরিবার নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছে।
পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। এ কারণে দাবি আদায়ে রোববার খাগড়াছড়ি দীঘিনালা ও সাজেক সড়কে কর্মবিরতি পালন করবেন তারা।
এদিকে গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। তাদের অন্যতম দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নিতে হবে। সংগঠন দুটির অভিযোগ, এসব সশস্ত্র সদস্যের কারণে এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তবে পিসিজেএসএস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সংগঠনটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার দাবি, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
মূলত দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যেই সাজেকে টানা অবরোধ চলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ও স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তবে সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হবে বলে জানান।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেন। এতে স্থানীয় মানুষের খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে এক দিনের জন্য কর্মসূচি শিথিলের কথা জানানো হয়।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর প্রথম দফায় অবরোধ শুরু হলে সাজেকে প্রায় দেড় হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। সে সময় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় অবরোধ শুরু হয়। তবে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর কর্মসূচি স্থগিত রাখা হলেও ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ২২ অক্টোবর থেকেই সাজেক পর্যটন ভ্যালি বন্ধ রেখেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দায়ী করলেও অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংগঠনটি। পরে হামলা, লাঠিপেটা এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে ২৪ অক্টোবর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ পালন করে ছাত্র জনতার সংগ্রাম পরিষদ।
এ অবস্থায় একদিকে সাজেকে অবরোধ শিথিলের ঘোষণা, অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি ও পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতির প্রস্তুতি দুইয়ের প্রভাবে রোববার খাগড়াছড়ি দীঘিনালা সাজেক সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় আছে।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কায় কিসলু বলেন, ‘খাগড়াছড়ি পরিবহন শ্রমিকদের ডাকে সকাল থেকে সাজেক দীঘিনালা এবং খাগড়াছড়ি সড়কে অবরোধ চলছে। তবে সকাল থেকে কোনো ধরনের সহিংসতার খবর আমরা পায়নি।’