প্রভাত ডেস্ক : মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে ভাঙচুরের এক বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। সেগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। গাজীপুর শহরের রেললাইনের পশ্চিম পাশে মুক্তমঞ্চে নির্মিত ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ স্থাপনাও পড়ে আছে ভাঙাচোরা অবস্থায়। মাদারীপুর পৌর শহরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানের ভাঙা মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট ভাস্কর্যও সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জেলা থেকে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এসেছে। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ছাড়াও দেশের ৩৩টি মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ক্ষতি হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাদুঘর, স্মৃতিসৌধ ও বধ্যভূমি।
গত বছরের ২০ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘সারা দেশে দেড় হাজার ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে ৫ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য (সিরামিক বা টেরাকোটা দিয়ে দেয়ালে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা অবয়ব), ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলার তথ্য পেয়েছেন। বেশির ভাগ ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট। এসব ভাস্কর্য ও ম্যুরালের বেশির ভাগই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক।
এসব সংস্কারে কত টাকা লাগতে পারে, তা-ও জানাতে পারেনি। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের এত টাকা নেই। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়ার পর সংস্কারের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে টাকা চাওয়া হবে। বিভিন্ন জেলা থেকে তথ্য আসছে। চূড়ান্ত করতে সময় লাগবে।
তবে সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট কতটি ভাস্কর্য, ম্যুরাল, স্মৃতিস্তম্ভ বা জাদুঘর–বধ্যভূমিতে ভাঙচুর করা হয়েছে, সে তথ্য এখনো জোগাড় করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এসব সংস্কারে কত টাকা লাগতে পারে, তা-ও জানাতে পারেনি। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের এত টাকা নেই। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়ার পর সংস্কারের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে টাকা চাওয়া হবে। বিভিন্ন জেলা থেকে তথ্য আসছে। চূড়ান্ত করতে সময় লাগবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম মনে করেন, মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সকে নতুন করে সাজানো উচিত। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় নেই। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দেশের মানচিত্র, নদী, মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর নতুন করে সাজাতে হবে, যেখানে ইতিহাস বিকৃতি হবে না।
মুক্তিযুদ্ধ স্থাপনায় যারা হামলা করেছে, তাদের নামে কোথাও কোনো মামলা হওয়ার কথা জানা যায়নি। উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, মামলা করার পরিবেশ তখন ছিল না। এখন দেরি হয়ে গেছে। তবে কেউ যদি মামলা করতে চায়, সরকার সহযোগিতা করবে।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জেলা থেকে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এসেছে। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ছাড়াও দেশের ৩৩টি মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ক্ষতি হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাদুঘর, স্মৃতিসৌধ ও বধ্যভূমি।
মেহেরপুর
স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট বিকেল ও সন্ধ্যায় দুই দফায় মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার যেখানে শপথ নিয়েছিল, সেখানে নির্মিত হয় মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স। গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো ভাস্কর্যের মাথা নেই, কোনোটি খণ্ডিত অবস্থায় পড়ে আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের আদলে নির্মিত ভাস্কর্যটির কিছুই অবশিষ্ট নেই।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ ও শরণার্থীদের দুর্ভোগ তুলে ধরা শিল্পকর্মগুলোর অনেকগুলোই এখন চেনার উপায় নেই। এখানে–সেখানে পড়ে আছে পানির বোতল, পরিত্যক্ত পলিথিন।
মুক্তিযুদ্ধকালে ১৭ এপ্রিল জাতীয় চার নেতাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার ভাস্কর্যও ভাঙচুর করা হয়েছে। মুজিবনগর সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানকারী আনসার সদস্যদের একজন মোহাম্মদ আজিমুদ্দিন শেখ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মুজিবনগরে আঘাত মানে স্বাধীনতাকে আঘাত করা। ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা রুখতে সরকারকে কঠোরভাবে এগোতে হবে।’
মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ আল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, যে জায়গা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু, সেখানে যদি এমন অবস্থা থাকে, তবে নতুন প্রজন্ম কী শিখবে? তিনি দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন।
মেহেরপুর জেলা গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামাল উদ্দীন গণমাধ্যমকে জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রতিনিধিদল স্মৃতি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেছে। ভাঙচুর হওয়া ছোট-বড় প্রায় ৪০০টি ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণের জন্য একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি ‘গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখা হবে বলে জানান মেহেরপুর জেলা প্রশাসক সৈয়দ এনামুল কবির।
গাজীপুর
গাজীপুর শহরের জয়দেবপুর রেললাইনের পশ্চিম পাশে মুক্তমঞ্চে নির্মিত ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ ভাস্কর্যটি গত বছর ৫ আগস্ট বিকেলের দিকে ভেঙে ফেলা হয়। ১৩ ফুট উচ্চতার ৯টি ভাস্কর্যের প্রতিটির হাঁটু পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সামনের দিক থেকে এখন আর ভাস্কর্যের কোনো অবয়ব দৃশ্যমান নয়। বিগত সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ভাস্কর কুয়াশা বিন্দুর নির্মিত এ ভাস্কর্য উদ্বোধনের আগেই ভেঙে ফেলা হয়।
গত রোববার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা–কর্মীদের ব্যানার–ফেস্টুনের কারণে সামনে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই সেখানে কোনো ভাস্কর্য ছিল। পেছন দিক থেকে ভাস্কর্যের ভাঙা অংশ দেখা যায়। নিচে ময়লা–আবর্জনার স্তূপ জমে আছে।
সবজি বিক্রেতা আজিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলনের সময় এটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর পর থেকে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে।’
নতুন করে ভাস্কর্য নির্মাণ করতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করার কথা জানিয়ে গাজীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার পেছনে গাজীপুরবাসীর এই রক্তঝরা প্রতিরোধই বাঙালিকে যুদ্ধের সাহস জুগিয়েছিল। সেই স্মৃতি রক্ষা না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, এটাই আজ সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।
সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাস্কর্যের ভাস্কর কুয়াশা বিন্দু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পরিশ্রম ও সাধনা করে ভাস্কর্যটি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেটি ভেঙে ফেলা হয়। এ দৃশ্য দেখার পর থেকে এখনো আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি!’
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলম হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, তাই ভাস্কর্যগুলোর বিষয়ে খুব একটা তথ্য আমার কাছে নেই। তবে আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
মাদারীপুরের শিবচরে সরেজমিনে দেখা গেছে, শিবচরের চৌধুরী ফাতেমা বেগম পৌর অডিটরিয়ামের সামনে নির্মিত ‘প্রবহমান ৭১’ ভাস্কর্যটি ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। উপজেলা পরিষদের সামনের ‘মুক্তবাংলা’, উপজেলার প্রবেশমুখে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ, কলেজ মোড় এলাকার স্বাধীনতা চত্বরসহ অন্তত পাঁচটি স্থানের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। এ ছাড়া মাদারীপুর পৌর শহরের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সামনে ও লেকপাড়ে ভাঙচুর করা নির্মাণাধীন ভাস্কর্য পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি খুব সেনসিটিভ (স্পর্শকাতর)। উপজেলা চত্বরে যে দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যটি ছিল, সেটি আবার দাঁড় করানো সম্ভব নয়। অপসারণ করে নতুন করে কিছু করা যেতে পারে।’
দ্রুত সংস্কার করতে হবে
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে দেশের ৬৪ জেলায় একটি করে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় আলাদা করে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট ও এর পরের কয়েক দিন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সেও ভাঙচুর চালানো হয়। তবে কতটি জেলা ও উপজেলায় ভাঙচুর হয়, এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।
কতটি জেলা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা জানতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, যেসব মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের আয় বেশি, তারা ৪০ শতাংশ অর্থ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। সে নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডসহ কয়েকটি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স সংস্কার করেছে। আর যারা নিজেদের টাকায় কমপ্লেক্স সংস্কার করতে পারবে না, তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও কত টাকার প্রয়োজন, তা মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, সব ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ে টাকা চেয়ে চিঠি দেওয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কোনো সংঘাত নেই। তবু ৫ আগস্টের দিন ও পরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নকে আক্রমণ করেছে একটি চক্র। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর করা মানে হচ্ছে ইতিহাসকে পদদলিত করা।
মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট স্থাপনা ভাঙচুরের বিষয়টিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত ছিল উল্লেখ করে মফিদুল হক বলেন, এখনো সময় আছে। মুজিবনগর সরকারের স্মৃতি কমপ্লেক্স ও ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘর—এই দুটি স্থাপনাকে প্রতীকীভাবে নিয়ে অবিলম্বে সংস্কার করতে হবে। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধ চিহ্নকে দ্রুত সংস্কার করতে হবে।