• সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৩ অপরাহ্ন
Headline
ইয়েমেনে হুথিদের স্থাপনা লক্ষ্য করে একযোগে ১৩টি বিমান অভিযান সেনাবাহিনীর কেপ ভার্দেতে বাস খাদে পড়ে ২৫ শিশু-কিশোর নিহত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: ইন্দোনেশিয়ায় বন্ধ ৮ বিমানবন্দর ট্রাম্পের ম্যাপে নিউ মেক্সিকো হয়ে গেল ‘নিউ আমেরিকা’ পাঠ্যবই থেকে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দ বাদ দিতে বলা ব্লেয়ারই এখন গাজার শান্তি পর্ষদে জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে বড় জয়ের পথে কট্টরপন্থী এএফডি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৬ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক মন্দাভাবের মধ্যেও মুনাফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়লেও আদায়ে বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে ব্যাংকিং খাত জরুরি রক্ষণাবেক্ষণে সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের কারখানা বন্ধ

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন দেশের শিল্পমালিকেরা

Reporter Name / ৮৩ Time View
Update : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: গ্রিডের বিদ্যুৎ চলে গেলেও এখন আর কারখানার চাকা বন্ধ হচ্ছে না। লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশের একের পর এক কারখানার ছাদ রূপান্তর করা হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং ব্যয়বহুল জেনারেটরের ব্যবহার এড়াতে দেশের শিল্পমালিকেরা এই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন।
কারখানাগুলোর কাছে রুফটপ সোলার এখন কেবল বিদ্যুৎ বিল কমানো বা বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর শর্ত পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের সময়েও উৎপাদন সচল রাখার এক নির্ভরযোগ্য উপায় হয়ে উঠেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটেরও বেশি ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এর একটি বড় অংশ রয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায়। তবে ইলেকট্রনিক্স, ইস্পাত, কাচ, সিরামিক এবং টেক্সটাইল খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও দ্রুত তাদের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। জ্বালানি সংকট ঘনীভূত হওয়ার কারণে গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। যেমন ওয়ালটন গ্রুপের কারখানাগুলোতে এখন রুফটপ সোলার থেকে ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা কোম্পানির মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ মেটায়।
ওয়ালটন গ্রুপের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘শিগগিরই আরও ২৫ মেগাওয়াট সোলার স্থাপন করা হবে। এর ফলে বছরের শেষ নাগাদ আমরা আমাদের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করতে পারব।’ তিনি জানান, বছরে প্রায় ২৮,৫০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এই সিস্টেমে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় মাত্র ৪ টাকা ২০ পয়সা, যা প্রচলিত জেনারেটরের খরচের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।
এই আনুমানিক খরচের মধ্যে প্রাথমিক সেটআপ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সিস্টেমের জীবনকালও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে লোডশেডিংয়ের সময় দিনের বেলায় এই সৌরবিদ্যুৎ একদিকে যেমন গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমায়, অন্যদিকে ডিজেল বা গ্যাস জেনারেটরের ব্যয়বহুল ব্যবহার থেকে মুক্তি দেয়। তবে যেসব কারখানায় ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) রয়েছে, তারা দিনের আলোর বাইরেও এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।
নরসিংদীর ঘোড়াশালে আকিজবশির গ্রুপের কারখানা জনতা জুট মিলসে ২১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এই প্ল্যান্টে একটি ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমও রয়েছে, যা সূর্যাস্তের পরও কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ দেয় এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমায়। ২০২৩ সাল থেকে চালু হওয়া এই প্ল্যান্টে চীনের তৈরি ট্রিনা সোলার প্যানেল এবং হুয়াওয়ে ইনভার্টার ব্যবহার করা হয়েছে, যা বছরে প্রায় ২.৭৬ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। আকিজবশির গ্রুপের প্রজেক্ট ম্যানেজার হুসাইন মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘সোলার সিস্টেম আমাদের লোডশেডিংয়ের ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং অনেক কম খরচে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ করে দিয়েছে।’ গ্রুপটি হবিগঞ্জে তাদের আকিজ গ্লাস কারখানায় আরও ১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে, যার মধ্যে ৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম রয়েছে। আল আমিন বলেন, ‘ব্যাটারি সিস্টেমযুক্ত কারখানাগুলোতে লোডশেডিংয়ের সময়ও প্রায় শতভাগ উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব।’
আকিজবশির গ্রুপের পার্টিকেল বোর্ড, সিরামিক, গ্লাসসহ বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে প্রায় ৯০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা রয়েছে। তারা আরও ৫০ মেগাওয়াট যুক্ত করার কাজ করছে এবং আগামী দুই বছরে আরও ৭৫ মেগাওয়াট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রুপের কারখানাগুলোর মোট ১,২৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ এই সৌর উৎস থেকে আসছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকটের এই সময়ে কারখানার চাকা সচল রাখার এই ক্ষমতা দিন দিন আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে।
১৮টি শিল্প পার্কে ডজন খানেক কারখানা পরিচালনা করা এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তাদের ২০টি কারখানায় প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার সিস্টেম স্থাপন করেছে। তাদের মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮০ মেগাওয়াট।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহে লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কিন্তু যেসব কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ রয়েছে, সেখানে আমরা স্বস্তিতে ছিলাম।’ গ্রুপটি বর্তমানে তাদের চাহিদার ১৫-১৬ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটাচ্ছে এবং বছরের শেষ নাগাদ এটি ৫০ শতাংশে উন্নীত করার আশা রাখছে। কামাল বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে আমাদের শতভাগ চাহিদা পূরণ করা।’ কিছু প্রস্তুতকারকের কাছে এটি প্রথমে জ্বালানি সংকটের প্রতিক্রিয়া হিসেবে শুরু হলেও এখন তা সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘গ্যাস সংকট মোকাবেলায় ২০১৯ সালে আমরা প্রায় বাধ্য হয়ে কারখানায় সোলার স্থাপন করেছিলাম। পরে খাঁটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা অন্যান্য কারখানায় সোলার স্থাপন করি, কারণ সৌরবিদ্যুতের খরচ গ্রিড বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক।’ গ্রুপটির বর্তমানে ছয়টি কারখানায় ১৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার রয়েছে। সোলার থেকে তাদের দুটি পোশাক কারখানায় ৬০ শতাংশ এবং দুটি স্পিনিং মিলের প্রায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো হচ্ছে।
কারখানার মালিকদের জন্য এই হিসাবগুলো উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সংযোগের ধরনের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানে শিল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ১২ টাকা ৭৩ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৮৫ পয়সা পর্যন্ত, যা রাতের পিক আওয়ারে প্রায় ১৬ টাকায় পৌঁছায়। বিপরীতে, প্রকল্প ও প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে রুফটপ সোলারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়ে মাত্র ৪ থেকে ৮ টাকা। তাছাড়া এই সিস্টেম স্থাপনের খরচও আগের চেয়ে অনেক কমেছে।
সুপার স্টার রিনিউয়েবল এনার্জির প্রধান নির্বাহী মিজানুর রহমান বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে এক মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপনে খরচ হতো প্রায় ৫ কোটি টাকা। এখন সেই খরচ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকায়।’ তাঁর কোম্পানি প্রায় ৯০টি শিল্প কারখানায় ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার স্থাপন করেছে এবং আরও ১০টির বেশি প্রকল্পে কাজ করছে, যা থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট যুক্ত হবে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার ২০২১ সাল থেকে প্রায় ১০০টি শিল্প কারখানায় ১৩০-১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে এবং ১২টি কারখানায় আরও ২০ মেগাওয়াট স্থাপনের কাজ চালাচ্ছে। ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী মাসুদুর রহিম বলেন, জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার পর গত দুই বছরে সোলার স্থাপনের গতি অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি সোলার প্ল্যান্টের জীবনকাল প্রায় ২০-২৫ বছর। একবার বিনিয়োগের পর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া তেমন কোনো খরচ নেই।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category