মো: বাবুল শেখ ,পিরোজপুর : পিরোজপুরে কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মোট ২ হাজার ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে পিরোজপুর এখন শীর্ষে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ৯ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯৯ জন। এর মধ্যে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ২৭ জন, নাজিরপুরে ১৬ জন, নেছারাবাদে ২৭ জন, কাউখালীতে ৭ জন, ভান্ডারিয়ায় ১৯ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৩ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।ইন্দুরকানী (জিয়ানগর) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই।চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৩৬ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। জেলা হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি রোগী : হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ৯১০ জন ডেঙ্গু রোগী পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া ভান্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৮৯ জন, নেছারাবাদে ৩৫৯ জন, নাজিরপুরে ১৫০ জন, কাউখালীতে ১৩৬ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৯২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। শয্যা সংকটে মেঝেতেও চিকিৎসা :
রোগীর চাপ বাড়ায় পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে দেখা দিয়েছে শয্যা ও জায়গার সংকট। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় হাসপাতালের মেঝেতেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগীরাও ভোগান্তিতে পড়ছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগী জানান, কয়েক দিন ধরে জ্বর, দুর্বলতা, বমিভাবসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন তারা। হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবে থাকা ও সেবা নিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। চিকিৎসাধীন মারুফা আক্তার বলেন, শরীরে তীব্র দুর্বলতা, ক্লান্তি ও বমিভাব রয়েছে। ওষুধ দেওয়া হলেও এখনো পুরোপুরি সুস্থ বোধ করছি না। হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। ঠিকমতো থাকার জায়গা ও সেবা পেতে কষ্ট হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক ডেঙ্গু রোগী নিয়ম মেনে মশারি ব্যবহার করছেন না। দায়িত্বে থাকা এক নার্স জানান, বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও সচেতনতার অভাবে অনেক রোগী মশারি ব্যবহার না করে খুলে রাখছেন। এতে হাসপাতালে থাকা অন্য রোগী ও স্বজনদের মধ্যেও এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে ২৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় এনএস-১ কিট, ওষুধপত্র ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি নেই। ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
সুপারি-নারিকেল গাছের গোড়ায় মিলছে এডিসের লার্ভা : পিরোজপুরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে। পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, আইইডিসিআরের অনুসন্ধানে জেলার বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পিরোজপুরে প্রচুর সুপারি ও নারিকেল গাছ থাকায় কাটা গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি, নারিকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, স্থানীয় নালা এবং বিভিন্ন নার্সারির টবে জমে থাকা পানিতে বিপুল পরিমাণ এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন এবং বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিট মজুত রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পৌরসভা ও জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
পিরোজপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে শহরের বিভিন্ন নালা ও ড্রেনে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে। পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন জানান, জেলার বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও নালা পরিষ্কারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জনগণকে বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং দিন-রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।