………………….অধ্যাপক প্রিয়াঙ্কা প্রেয়তি স্নিগ্ধা…………………..
সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ পারে বেকার সমস্যার সমাধান করতে। একদিকে জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ, যা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হিসেবে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে; অন্যদিকে সীমিত চাকরির বাজার সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। ফলে কর্মসংস্থান প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
সরকারি চাকরি সব সময়ই সীমিত থাকবে, এটি বাস্তবতা। তাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। সরকার সরাসরি সব মানুষকে চাকরি দিতে পারবে না, কিন্তু চাকরি সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তা, বিদ্যুৎ, বন্দর এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয় এবং পরোক্ষভাবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। একইভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্কগুলোকে কার্যকরভাবে চালু করতে পারলে দেশি- বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে। সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো দক্ষতা উন্নয়ন। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে একটি বড় ফাঁক রয়েছে। এই ফাঁক কমাতে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষা পেলে বেকার সমস্যা অনেকাংশে সমাধান হয়। আইটি, মেশিন অপারেশন, ইলেকট্রনিক্স, স্বাস্থ্যসেবা—এই ধরনের খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে দেশীয় ও আন্তর্জতিক দুই বাজারেই কাজের সুযোগ বাড়বে।
বেসরকারি খাতের দিকে তাকালে দেখা যায় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তারাই । পোশাকশিল্প ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন বৈচিত্র্য আনা। আইটি সেক্টর, কৃষি প্রত্রিয়াজাত শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস, পর্যটন এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে বের করে এনে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, ব্যবসা নিবন্ধনের জটিলতা কমানো এসব পদক্ষেপ নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে ।
আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো প্রবাসী শ্রমবাজার। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থানের চাপও কমবে। তবে এক্ষেত্রে শ্রমিকদের দক্ষতা ও অধিকার দুই-ই নিশ্চিত করতে হবে । ডিজিটাল অর্থনীতিও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, অনলাইন সার্ভিস এসব খাতে তরুণরা ঘরে বসেই আয় করতে পারছে। সরকার যদি ইন্টারনেট সুবিধা উন্নত করে এবং প্রশিক্ষণ বাড়ায়, তাহলে এই খাত আরো বিস্তৃত হতে পারে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে । এর মধ্যে একটি বড় অংশই শিক্ষিত তরুণ—যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করেও উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। এই চিত্রটি আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন আমরা যুব বেকারত্বের দিকে তাকাই । তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশ, যা মোট বেকারত্বের তুলনায় অনেক বেশি। সংখ্যায় বেকারত্ব কম দেখালেও প্রকৃত কর্মসংস্থানের সংকট অনেক বড়। এই বাস্তবতার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট— প্রথমত, শিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের অনেকেই চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, শিল্প ও উৎপাদন খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা; যার ফলে নতুন বিনিয়োগ কমে যায় এবং কর্মসংস্থানও সীমিত থাকে । ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বেকারত্বের সমস্যা কেবল কোন সংখ্যার বিষয় নয়, এটি গুণগত একটি সংকট। একটি বড় বাস্তবতা হলো অনেক মানুষ কাজ করলেও তাদের আয় খুব কম বা কাজ স্থায়ী নয়, যা ‘গোপন বেকারত্ব’ হিসেবে বিবেচিত।
সমাজে অস্থিরতা বাড়লে আমরা দ্রুত একটি কারণ খুঁজি ‘বেকারত্ব’। কাজ নেই, আয় নেই, তাই মানুষ অপরাধে জড়ায় বা রাজনৈতিক উত্তেজনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। কিছুটা সত্য, কিন্তু পুরো সত্য নয়। কারণ সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কখনোই একক কোনো কারণে তৈরি হয় না; এটি বহু উপাদানের সম্মিলিত ফল। সত্য যে, দীর্ঘদিন কর্মহীনতা মানুষকে হতাশ করে, আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ করে, পারিবারিক টানাপড়েন বাড়ায়। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াতে পারে—এটাই মনোবিজ্ঞানে ‘স্ট্রেইন’ বা চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ, বৈধপথে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হলে কিছু মানুষ অবৈধ পথে ঝুঁকে পড়ে।
আবার সব বেকার মানুষ অপরাধে জড়ায় না, আর সব অপরাধীর পেছনে বেকারত্বও একমাত্র কারণ নয় । অপরাধ ও অস্থিরতার পেছনে আরো অনেক বিষয় কাজ করে— দুর্বল শাসনব্যবস্থা, আইনের অসম প্রয়োগ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, মাদক বিস্তার, সামাজিক বৈষম্য, এমনকি পারিবারিক ও শিক্ষাগত ঘাটতিও। বেকারত্বকে আমরা প্রায়ই একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখি। চাকরি নেই, আয় নেই, তাই কষ্ট । কিন্তু এর গভীরে রয়েছে আরেকটি অদৃশ্য সংকট। মানসিক অস্থিরতা। একজন বেকার মানুষের ভেতরে যে চাপ, হতাশা ও দ্বন্দ্ব কাজ করে, তা কেবল তার ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তার প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর।
কর্মসংস্থান বাড়ানো মানে শুধু অর্থনীতি শক্তিশালী করা নয়—এটি একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার পথও প্রশস্ত করে। সেজন্য শুধু কাজ নয়, দরকার ন্যায়বিচার, সুযোগের সমতা এবং দায়িত্বশীল রাজনীতি বেকারত্ব কমানো জরুরি, তবে তার সঙ্গে সঙ্গে সমান জরুরি সুশাসন ও সামাজিক আস্থার ভিত্তি শক্ত করা। আজকের বিশ্বে জনসংখ্যা আর সমস্যা নয়; সমস্যা হলো দক্ষতার অভাব ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি। তাই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিককে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে যুক্ত করা। ‘একজনও বেকার থাকবে না’—এটি হয়তো একটি আদর্শ লক্ষ্য, কিন্তু সেই লক্ষ্যেই এগোতে হবে পরিকল্পনা, নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। শুধু কর্মসংস্থান তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; দরকার মানসম্মত কাজ, যেখানে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা থাকবে। কারণ অনিশ্চিত ও অস্থির কাজ দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়নের ভিত্তি শক্ত করতে পারে না ।
অর্থনীতি আজ এক জটিল সময় অতিক্রম করছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিশ্বায়ন ও উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি বেকারত্ব একটি স্থায়ী চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে উন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল অঞ্চলের মধ্যে বেকারত্বের প্রকৃতি ও মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী বেকারত্বের হার বর্তমানে প্রায় ৪.৮-৫ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। সংখ্যার হিসাবে এটি প্রায় ২০ থেকে ২১ কোটি মানুষ (ILO-এর হিসাব অনুযায়ী) অর্থাৎ, পৃথিবীতে প্রতি ১০০ জন কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় পাঁচ জন কাজ পাচ্ছে না! বিভিন্ন দেশে বেকারত্বের হার ব্যাপকভাবে ভিন্ন। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সাধারণত বেকারত্ব তুলনামূলকভাবে কম, তবে তা সম্পূর্ণ সমস্যামুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশ, জার্মানিতে প্রায় ৫-৬ শতাংশ, ফ্রান্সে প্রায় ৭-৮ শতাংশ, স্পেনে প্রায় ৯-১০ শতাংশ।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার সার্ক (SAARC) দেশগুলোতে বেকারত্বের প্রকৃতি ভিন্ন। এখানে আনুষ্ঠানিক বেকারত্ব কম দেখালেও আংশিক বেকারত্ব বেশি। শিক্ষিত বেকার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ভারতে বেকারত্বের হার প্রায় ৫-৬ শতাংশ, বিপুল জনসংখ্যার কারণে সংখ্যায় বেকার অনেক বেশি। পাকিস্তানে বেকারত্বের হার প্রায় ৬-৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় বেকারত্বের হায় প্রায় ৪-৫ শতাংশ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে বুদ্ধি পেয়েছে। নেপালে বেকারত্বের হার প্রায় ১০-১১ শতাংশ, যা তরুণদের মধ্যে বেশি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে আফগানিস্তানে বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশ +
বাংলাদেশে বেকারত্ব নিয়ে আলোচনা হলেই একটি বিষয় সামনে আসে: সরকারি পরিসংখ্যান বলছে হার খুব বেশি নয়, কিন্তু বাস্তবে মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। এই বৈপরীত্যের কারণ খুঁজতে হলে আমাদের সংখ্যার ভেতরের বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৪ শতাংশ থেকে ৪.৭ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, চলমান অর্থনৈতিক চাপের কারণে এই হার ৫ শতাংশের কাছাকাছি যেতে পারে। সংখ্যার হিসাবে এটি খুব বেশি মনে না হলেও, বাস্তবে এর প্রভাব অনেক গভীর।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
( মতামত পাতাটি বাক-স্বাধীনতার প্রতীক। এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও প্রতিটি শব্দকে আমরা সন্মান করি। কারো কারো কাছে লেখা নিয়ে দ্বিমত থাকতেও পারে তবে এর জন্য সম্পাদককে দায়ী করা যাবে না। )