প্রভাত ডেস্ক: দক্ষিণ লেবাননে চলমান হামলা বন্ধ না করলে পাল্টা আক্রমণের সম্মুখীন হতে হবে বলে সতর্ক করার পরই ইসরায়েলে মিসাইল হামলা চালিয়েছে ইরান। জবাবে ইরানেও পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। মধ্য ও পশ্চিম ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান উপেক্ষা করেই এ হামলা চালাল ইসরায়েল। ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এর আগে টেলিগ্রামে একাধিক পোস্টে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, রবিবার স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে কয়েক দফা হামলা চালানো হয়। এতে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সাইরেন বেজে ওঠে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা ‘এখন পর্যন্ত ইরান থেকে আসা সব মিসাইল রুখে দিয়েছে’। হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর হোম ফ্রন্ট কমান্ড বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে বের হওয়ার পরামর্শ দেয়।
ইরানের গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে যে তারা ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের ‘টায়ার ও নাবাতিহ অঞ্চলের নিপীড়িত জনগণের ব্যাপক হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির’ জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আজ রাতের অভিযান ছিল একটি সতর্কবার্তা। যদি এই আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে এর জবাব হবে আরও ব্যাপক এবং এই অঞ্চলের সমস্ত আমেরিকান-জায়নবাদী লক্ষ্যবস্তু এর অন্তর্ভুক্ত হবে।’
হামলা শুরু হওয়ার পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই এক্সে লেখেন, ‘ইরান বারবার বলেছে যে তারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং লেবাননের বিরুদ্ধে আগ্রাসন সহ্য করবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজ রাতে আগ্রাসনকারীরা তাদের জবাব পেয়েছে। এই জবাব তাদের অপকর্ম বন্ধ করার সতর্কবার্তা; যেকোনো নতুন পদক্ষেপের পরিণতি হবে আরও ধ্বংসাত্মক এবং তাদের এর জন্য চরম মূল্য চোকাতে হবে।’
এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ‘এই মুহূর্তেই’ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করে ইরানে পাল্টা হামলা না চালানোর কথা বলবেন।
চ্যানেল ১২-এর সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন: ‘ইরানি হামলায় কেউ আহত হয়নি। আশা করি, ইসরায়েল এর প্রতিশোধ নেবে না। যদি বিবি (নেতানিয়াহু) তাদের ওপর পাল্টা হামলা চালায়, তবে গত ৪৭ বছর বা গত ৩ হাজার বছরের মতো এটি চলতেই থাকবে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি। এটি ভালো চুক্তি হতে যাচ্ছে। আমি চাই না, এখন যা ঘটছে, তার কারণে চুক্তিটি ভেস্তে যাক। আমি এখনই বিবিকে ফোন করে পাল্টা হামলা চালাতে নিষেধ করব। ওদের উভয়েরই মজা নেওয়া হয়ে গেছে। ইসরায়েল তাদের হামলা চালিয়েছে, ইরানও তাদের হামলা চালিয়েছে। আমাদের আর কোনো হামলার প্রয়োজন নেই।’
কিন্তু এখন স্পষ্ট মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের সেই ‘নিষেধ’ অমান্য করেই ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলিরা আমেরিকানদের অনুরোধ মানেনি, বরং ইরানের বিরুদ্ধে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ইসরায়েলের হামলার পর তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসফাহান ও তাবরিজেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লেবাননই। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন চলতে থাকে। এর জেরে ইরানের একাধিক সতর্কবার্তার পরই এই হামলা চালানো হয়। রবিবার আইআরজিসির খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি দাহিয়েহ-তে অব্যাহত হামলা চালিয়ে ইসরায়েল সমস্ত ‘রেড লাইন’ সীমা অতিক্রম করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম যে বৈরুতের শহরতলিতে যদি এই অপরাধের বিস্তার ঘটে, তবে আমরা অধিকৃত অঞ্চলগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাব।’ রবিবার বিকেলে দাহিয়েহের একটি জনবহুল বেসামরিক এলাকায় ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলায় অন্তত দুজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়।
ইরানের শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে তেহরান ‘কেবল আলোচনার পথই বন্ধ করবে না’, বরং ‘শত্রুর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে’ জড়াবে।