প্রভাত সংবাদদাতা, খুলনা: খুলনায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান চালিয়ে আরও ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। গতকাল রোববার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে গত পাঁচ দিনে যৌথ অভিযানে মোট ২৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন।
সোমবার কেএমপির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, নগরের বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে খুলনা থানার ৯ জন, সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ১০ জন, লবণচরা থানার ৪ জন, খালিশপুর থানার ৩ জন, দৌলতপুর থানার ২ জন, খানজাহান আলী থানার ৩ জন এবং ডিবি পুলিশের অভিযানে ২ জন আছেন। এসব অভিযানে ২০৪টি ইয়াবা ও ৯ পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে রবিবার রাতে নগরের লবণচরা থানার স্লুইসগেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘বি–কোম্পানি’র সদস্য হিসেবে পরিচিত সজল আকনকে (৩৪) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৬-এর স্পেশাল কোম্পানির একটি দল। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, বিশেষ ক্ষমতা আইন, চুরি ও মারধরের অভিযোগে খুলনার বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিশেষ অভিযান শুরু করে কেএমপি। গত বুধবার কেএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ অপরাধবিষয়ক সভায় নগরজুড়ে সমন্বিত অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যৌথ অভিযানের ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘গ্রেনেড বাবুর’ ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাব্বিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত কেএমপির দক্ষিণ বিভাগের পৃথক অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই অভিযানে একটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং ১১টি মোটরসাইকেল ও একটি পিকআপ জব্দ করা হয়। গত শুক্রবার ‘গ্রেনেড বাবুর’ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কসাই লিটন, রিফাতসহ ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। শনিবার গ্রেপ্তার করা হয় ৬২ জনকে এবং রোববার আরও ৭৪ জনকে। তাঁদের মধ্যে পলাশ গ্রুপের নেতা শেখ পলাশ ওরফে ‘চিংড়ি পলাশের’ সহযোগী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী কাজী রাফসান মাহমুদ ওরফে পার্থ আছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি নতুন চারটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন ফাঁড়িতে জনবল বাড়ানো হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিনের অভিযানে তালিকাভুক্ত চারজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন মামলার আসামি, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী ও চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল নজরদারি ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। খুলনা মহানগর ও জেলায় বর্তমানে ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত। এর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি–কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বি–কোম্পানিকে ঘিরে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে খুলনা নগরে ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর সংঘটিত ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিক ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।