প্রভাত অর্থনীতি: ঈদের ছুটির পর সাভারে আল-মুসলিম গ্রুপের ৭ পোশাক কারখানার মোট ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। শুধু আল-মুসলিম নয়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ছয়টি শিল্পাঞ্চলে কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
একদিকে ছাঁটাই হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কম, মত বিশ্লেষকদের। তাতে বেকার পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হচ্ছে। ২০২৪ সাল শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। তার আগের বছর (২০২৩ সাল) এই সংখ্যা ছিল সাড়ে ২৫ লাখ। গত বছরের হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিসি)।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা ভুগছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন ও রূপান্তর ঘটে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীলতা এসেছে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। বেড়ে যায় জ্বালানির দাম।
অন্যদিকে দেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের চাহিদা কমতির দিকে। সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব। নতুন বিনিয়োগ কম। চলছে ব্যয় সাশ্রয় ও কর্মী ছাঁটাই। নতুন নিয়োগের সংখ্যা প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। এমন প্রেক্ষাপটে ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করবেন। এটিই নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসায় গতি ফেরানো, বিনিয়োগ চাঙা করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোই এখন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে নজর থাকবে সবার।
জানতে চাইলে দেশের সুপরিচিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রথমেই সরকারের উপলব্ধি করা দরকার, দেশের অর্থনীতি এখনো সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই অর্থনীতির সুস্থ হয়ে উঠতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে বর্তমানে সংকটে থাকা বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে বিদ্যমান বিনিয়োগই অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক অবদান রাখার পরিবর্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বিনিয়োগকে দেখা হয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অনুপাতে। তিন বছর ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমছে।
বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে কমে হয় যথাক্রমে ২৪ দশমিক ১৮ এবং ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সর্বশেষ গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) সাময়িক হিসাবে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশি-বিদেশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অবস্থা বোঝার জন্য কয়েকটি পরিসংখ্যানের দিকে চোখ বোলানো যেতে পারে।
জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ: ২০২১-২২ ২৪.৫২%, ২০২২-২৩ ২৪.১৮%, ২০২৩-২৪ ২৩.৯৬%, ২০২৪-২৫ ২২.৪৮%।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা গত অর্থবছরের একই সময়ে তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি কম হওয়ার অর্থ হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণ কমেছে।
উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক অস্থিরতার বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়া রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই হার সাধারণত ১০ শতাংশের ওপরে থাকে।
বিষয়টি নিয়ে এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসা অর্ধেক কমে গিয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যবসা এখনো ১৮-২০ শতাংশ কম। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা কম থাকায় প্রতিষ্ঠানে চলতি মূলধনে টান পড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসার খরচ কমাতে বাজেটে বেশ কিছু উদ্যোগ থাকবে। অন্তত ১৯ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে করের হার কমানো হতে পারে।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমে যাওয়ার বিষয় পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই সূচকেও উঠে এসেছে। অর্থনীতির প্রধান চার খাত—উৎপাদন, কৃষি, নির্মাণ ও সেবা নিয়ে এই সূচক প্রণয়ন করা হয়। পিএমআই অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে অর্থনীতি সম্প্রসারণের গতি কমেছিল। পরের মাসে গতি কিছুটা বাড়লেও মার্চে কমে। গত এপ্রিলে পিএমআই সূচকের মান সামান্য বেড়ে হয় ৫৪ দশমিক ৫ পয়েন্ট।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসার খরচ কমাতে বাজেটে বেশ কিছু উদ্যোগ থাকবে। অন্তত ১৯ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে করের হার কমানো হতে পারে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের কর ছাড়ের সুবিধা দিতে পারে সরকার। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব লাইসেন্স ও অনুমোদন লাগে, সেগুলো স্বল্প সময়ে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে একগুচ্ছ ঘোষণাও থাকতে পারে বাজেটে।
বাজেটের আগেই দেশের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ শিল্পকারখানার জন্য থাকছে। এই ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে গড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে বেসরকারি খাত।
বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এফডিআইয়ে গতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু চেষ্টা করলেও ইতিবাচক কোনো প্রভাব পড়েনি। নতুন সরকারও চেষ্টা করছে। তবে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিগগিরই এফডিআইয়ে গতি পাবে এমনটা কেউ বলতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ (জুলাই-মার্চ) মাসে ১০০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ। তার মানে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে সাড়ে ২৩ শতাংশ।
কয়েকজন উদ্যোক্তা বলেন, দেশের ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। দেশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা যদি মসৃণ হয়, তাহলে বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিনিয়োগ সেবা আরও সহজ করতে বিডা, বেজা, বেপজা, পিপিপিএ এবং হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মতো বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একীভূত করা; চীনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে সেখানে বিডার অফিস চালু ইত্যাদি।আশিক চৌধুরীর মতে, সামগ্রিকভাবে এই পরিকল্পনা বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে সহায়ক হবে।
সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস একটি রপ্তানিমুখী সুতা উৎপাদনের কারখানা। এটি চালাতে গ্যাস লাগে। মালিকপক্ষ জানিয়েছে, তাঁদের কারখানায় গ্যাসের অনুমোদিত চাপ ১০ পিএসআই (গ্যাসের চাপ পরিমাপের একক)। তবে তাঁরা পান দেড় থেকে দুই পিএসআই।
গ্যাস না পেয়ে কারখানাটির কর্তৃপক্ষ সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের ব্যবস্থায় ১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তবু বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সমস্যার সমাধান হয়নি। কারখানাটি উৎপাদন সক্ষমতায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।
লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শুধু গ্যাস–সংকটের কারণে গত চার বছরে আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে।’
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, যেকোনো উপায়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি চাহিদা কমিয়ে রাখে। তা ছাড়া মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে টাকার অবমূল্যায়নে চাপ বাড়বে। সেটি হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে। তাতে ব্যবসার খরচ বাড়বে। তাঁর মতে, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় মধ্য মেয়াদে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে। নতুন কূপ খনন করার মাধ্যমে জ্বালানি নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে হবে।
এম মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার কাজ শুরু করতে হবে। যেসব সমস্যা বেশি ভোগাচ্ছে, সেগুলো আগে সমাধান করতে হবে।