প্রভাত অর্থনীতি: দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে গঠিত পাঁচ বছর মেয়াদি এই স্কিমের আওতায় কৃষকেরা কম সুদে ঋণ পাবেন। সোমবার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ থেকে এ–সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
দেশের প্রকৃত চাষি ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এই ঋণ দেয়া হবে। তবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও নিয়ম মেনে গ্রাহক নির্বাচন করা হবে:
কারা পাবেন: ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গাচাষি ও নারী কৃষকেরা এই ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন। প্রকৃত কৃষক চিহ্নিত করতে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বা সরকারের ‘কৃষক কার্ডের’ তথ্য ব্যবহার করা হবে।
জামানতবিহীন ঋণ: ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা এককভাবে জামানত ছাড়াই শুধু শস্য-ফসলের দায়বদ্ধতার বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা দলগত সামাজিক জামানত বিবেচনা করা হবে।
কারা পাবেন না: কোনো কৃষক বা গ্রাহক যদি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি হয়ে থাকেন, তবে তিনি এই স্কিমের আওতায় ঋণ পাবেন না।
ঋণের ব্যবহার ও সীমা: এই ঋণ কোনোভাবেই পুরোনো ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না । একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ তিনবার এই স্কিমের সুবিধা নিতে পারবেন।
কৃষি ও পল্লি খাতের প্রায় সব বড় শাখাতেই এই ঋণ দেয়া হবে। একজন গ্রাহকের জন্য খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ ঋণের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এ রকম: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত: সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা। শস্য ও ফসল খাত: সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা (সর্বোচ্চ ৫ একর জমিতে চাষাবাদের জন্য ফসল দায়বদ্ধতার বিপরীতে)। কৃষি যন্ত্রপাতি খাত: সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা।
আয় উৎসারী কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য পল্লি ঋণ: সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা। সুদের হার গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণের সুদের হার অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
সর্বোচ্চ সুদ/মুনাফা: গ্রাহক বা কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার হবে ৮ শতাংশ (সরল সুদে)। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও মুনাফার হার কোনোভাবেই ৮ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
ব্যাংকের তহবিল খরচ: বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে এই তহবিল বা পুনঃ অর্থায়নের সুবিধা পাবে।
মোট বরাদ্দ: এই স্কিমের মোট আকার ১০ হাজার কোটি টাকা। এটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য তহবিল, অর্থাৎ আদায় হওয়া টাকা আবার ঋণ হিসেবে বিতরণ করা যাবে।
তহবিল বণ্টন: ব্যাংকগুলোর চাহিদা ও বার্ষিক কৃষিঋণ বিতরণের সক্ষমতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিল বরাদ্দ দেবে। ঋণ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ‘অংশগ্রহণ চুক্তি’ সই করতে হবে।
প্রচারণা: সহজ শর্তের এই ঋণ সম্পর্কে কৃষকদের জানাতে ব্যাংকের প্রতিটি শাখার ভেতরে ও বাইরে ব্যানার টাঙাতে হবে এবং চাষের মৌসুম শুরুর আগেই বিশেষ প্রচারণা চালাতে হবে।
ঋণের মেয়াদ ও গ্রেস পিরিয়ড: কৃষক পর্যায়ে খাত বিবেচনায় সর্বোচ্চ তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ (ঋণ পরিশোধ শুরুর পূর্ববর্তী সময়) ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১৮ মাস।
আদায়ের দায় ব্যাংকের: কৃষকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট বিতরণকারী ব্যাংকের। কৃষকেরা টাকা ফেরত দিলেন কি না, তার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা মেলানো যাবে না। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে টাকা নেবে, তা ১৮ মাসের মধ্যে সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে।
কঠোর তদারকি ও জরিমানা: যদি কোনো ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ৮ শতাংশের চেয়ে বেশি সুদ আদায় করে কিংবা তহবিলের অপব্যবহার করে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকের ওপর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ২ শতাংশ জরিমানা আরোপ করে এককালীন টাকা আদায় করে নেবে। নির্ধারিত সময়ে ব্যাংক টাকা পরিশোধ না করলে বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা ওই ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে টাকা কেটে নেয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের বিস্তৃত গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়াতে এ উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখবে।