প্রভাত রিপোর্ট: বাংলাদেশে ৩৫ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। তামাক ব্যবহারজনিত কারণে প্রতিবছর দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এ খাতের আদায়কৃত রাজস্বের চেয়ে দ্বিগুণ। ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে ‘তামাকমুক্ত’ করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা দেশের বাজারে সস্তা ও সহজলভ্য সিগারেটের উপস্থিতি। বিশেষ করে নিম্ন স্তরের (লো-টিয়ার) সিগারেটের ওপর কার্যকর কর আরোপ না করায় তরুণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপান এবং তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের প্রবণতা কমছে না।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে বাজারে বিক্রিত মোট সিগারেটের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই নিম্ন স্তরের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সিগারেটের দামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল এবং ভারতের নিচে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর বাজেটে সিগারেটের দাম যেভাবে বাড়ানো হয়, তা মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় খুবই সামান্য।
বর্তমানে প্রচলিত চার স্তরবিশিষ্ট (নিম্ন, মধ্য, উচ্চ ও প্রিমিয়াম) জটিল কর কাঠামোর কারণে কোম্পানিগুলো ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার সুযোগ পায়।
সিগারেটের দাম মূল্যস্ফীতি ও আয় বৃদ্ধির তুলনায় কম বাড়ায় তা প্রকৃত অর্থে সস্তাই থেকে যাচ্ছে। উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম কিছুটা বাড়ানো হলে ধূমপায়ীরা ধূমপান ছাড়ার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কমদামী বা নিম্নস্তরের ব্র্যান্ডে স্থানান্তরিত (সুইচ) হওয়ার সুযোগ পায়, যা কর রাজস্বের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে।
বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দেশে সস্তা ব্র্যান্ডের অনেক সিগারেট পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ব্যাপকহারে সিগারেটের খুচরা শলাকা (সিঙ্গেল স্টিক) বিক্রি হয়। এর সরাসরি শিকার হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম ও নিম্নবিত্ত মানুষ। মাত্র ছয়-সাত টাকায় একটি সিগারেট কিনতে পারায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সহজেই এই মরণব্যাধিতে আসক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের আয়ের একটি অংশ সিগারেটের পেছনে ব্যয় করায় পুষ্টিকর খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের পরিবার।
তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগের প্রকোপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তা তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি। সস্তা সিগারেটের সহজলভ্যতা এই চিকিৎসা ব্যয় এবং অকাল মৃত্যুর মিছিলকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর এ বিষয়ে বলেন, বর্তমানে সিগারেট ব্যবহারকারীর অধিকাংশই নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের ভোক্তা। নিম্ন এবং মধ্যম এই দুই স্তর একত্রিত করে সিগারেটের মূল্যস্তর সংখ্যা ৪টি থেকে কমিয়ে ৩টিতে নামিয়ে আনতে পারলে তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধূমপানে নিরুৎসাহিত হবে।
দেশের তামাকের জটিল কর কাঠামোর প্রসঙ্গে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তামাক ব্যবহার করা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তামাকের ব্যবহার কমানোর অন্যতম কার্যকর এবং শক্তিশালী একটি উপায় হচ্ছে দাম বাড়ানো। দাম এতোটা বাড়াতে হবে, তা যেন মূল্যস্ফীতির থেকেও বেশি হয়। বাংলাদেশে সিগারেটের ওপরে স্তর ভিত্তিক ট্যাক্স আরোপ করা হয়, এটাকে অ্যাডভেলরেম পদ্ধতি বলা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোক নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের ভোক্তা। কিন্তু দেশে ট্যাক্স নিম্ন স্তরে কম, উচ্চস্তরে বেশি। আমরা চাই সবাই যেন তামাকের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। দাম বাড়ালে অনেকে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে দেয়, অথবা ছেড়ে দেয় এবং যারা ব্যবহার শুরু করত, তারা নিবৃত্ত হয়। ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, দেশে সিগারেটের চারটি স্তরের সুবিধা নিয়ে কোম্পানিগুলো ট্যাক্স কম দেওয়ার জন্য বেশিরভাগ পণ্য নিম্ন বা মধ্যম স্তরে তালিকাভুক্ত করে। এই যে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা, সেটাও বহুস্তরের কারণে হয়।
তামাকের ব্যবহার কমাতে করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিগারেটের চারটি স্তরকে কমিয়ে এনে সুনির্দিষ্ট ট্যাক্স আরোপ করতে হবে। এখন যেমন দামের ওপরে শতাংশ হিসেবে ট্যাক্স নেওয়া হয়, সেটা না করে স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ করতে হবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে এবং নতুন কেউ ধূমপান শুরু করবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ব্যবহারের ফলে আমাদের যে স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি হয়, তার পরিমাণ তামাক থেকে পাওয়া রাজস্বের প্রায় তিনগুণ বেশি। তিনি আরও বলেন, তামাক একটা নেশাজাতীয় পণ্য, একবার শুরু করলে এটা ছাড়তে পারা খুব কঠিন। ট্যাক্স ইমপোজ করে তামাকের ব্যবহার কিছুটা কমানো যেতে পারে। এ ছাড়া যারা স্টুডেন্ট, কম আয়ের মানুষ ধূমপান শুরু করতে যাচ্ছে, তারা হয়তো দাম বাড়লে ব্যবহার করবে না। পাশাপাশি তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই।
তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ সফল করতে তামাকবিরোধী সংগঠনসমূহ বেশ কিছু জরুরি দাবি জানিয়ে আসছে, সেগুলো হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কর প্রবর্তন, জটিল স্তরভিত্তিক কর কাঠামো বাতিল করে সব সিগারেটের ওপর একটি একক ও শক্তিশালী সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ, আইন সংশোধন করে খোলা বা একক শলাকা সিগারেট বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। তামাকজাত পণ্যের দাম এমন স্তরে নিয়ে যাওয়া যাতে তা তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার একেবারে বাইরে চলে যায়।
নিম্ন স্তর এবং মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ, উচ্চ স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৪০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা নির্ধারণ, প্রিমিয়াম স্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ১৮৫ টাকা থেকে ২০০ বা তার থেকে বেশি মূল্য নির্ধারণ করা। খুচরা মূল্যের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ৪ (চার) টাকা পরিমাণ সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করা।
ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়িতে অভিন্ন মূল্য ও করভার প্রচলন করে ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৪৮ টাকা থেকে ৬০ টাকা এবং ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। বিড়ি, জর্দা এবং গুলের ওপর এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত হারে সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করা। এ ছাড়াও সকল তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখা।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তামাক কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে তামাক খাত থেকে পঁচাশি হাজার কোটি টাকার অধিক রাজস্ব আয় অর্জিত হবে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার কোটি টাকা বেশি। পাশাপাশি প্রায় পাঁচ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। একইসাথে দীর্ঘমেয়াদে ১ লাখ ৮৫ হাজার তরুণসহ ৩ লাখ ৭০ হাজারের অধিক মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।
তামাকবিরোধী সংগঠন এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, তামাকের ব্যবহার কমাতে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। তবে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সবার আগে সস্তা সিগারেটের বাজার বন্ধ করতে হবে। কর পলিসিতে বড় ধরনের সংস্কার না আনলে ২০৪০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।