• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ন
Headline
বাবা ও স্ত্রীর জানাজায় মোজতবার অনুপস্থিতি নিয়ে আবারও গুঞ্জন, বাড়ছে উদ্বেগ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৩৫, পৌঁছাতে পারে ১০ হাজার থেকে ১ লাখে যুদ্ধবিরতির আট মাস পরও গাজায় পড়ে আছে মরদেহ, শিশুদের কামড়াচ্ছে ইঁদুর লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোমে খামেনির জানাজা সম্পন্ন ইন্দোনেশিয়াকে ‘অস্ত্র’, ‘ব্রহ্মোস’ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে ভারত পুতিন-জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপ: ইউক্রেন যুদ্ধ সমাধানের খুব কাছাকাছি, বললেন ট্রাম্প পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধাঁর মুখোমুখি বাংলাদেশের তদন্তকারীরা সুদ ব্যবধানে ধাক্কা খাবে দেশের এসএমই খাত উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত ইস্পাত উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে চীনের পোশাক বাজারের অংশীদারিত্ব দখল করছে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম: র‍্যাপিড

‘নিখোঁজ’ কনটেইনারের ক্ষতিপূরণ দাবি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: ‘নিখোঁজ’ কনটেইনারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মধ্যকার বিরোধ নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। উভয়পক্ষই একে অপরের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি কার্যক্রমে ব্যর্থতার দায় নিয়েও দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে।
দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় কাস্টমসের একটি অভিযোগ থেকে। কাস্টমস দাবি করে, গত নয় মাসে তাদের অডিট, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) ইউনিট অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে প্রায় ২৫০টি কনটেইনার লক করেছিল; কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এগুলোর কোনো হিসাব দিতে পারেনি। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, অভিযোগটি ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রহস্যময়ভাবে ২৫০ ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি কনটেইনার ‘গায়েব’
নিলামে বিক্রি হওয়া একটি কনটেইনার সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে হস্তান্তর করতে না পারায় বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ১.০৬ কোটি দাবি করে কাস্টমস। এরপরই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় কাস্টমসের বিরুদ্ধে হাজার হাজার পরিত্যক্ত কনটেইনার নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হওয়ার পাল্টা অভিযোগ তোলে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, কাস্টমসের এমন ব্যর্থতায় ইয়ার্ডে কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে গত তিন দশকে স্টোরেজ বাবদ বন্দরের সম্ভাব্য ৮–১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলছেন, ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর ও বৃহত্তম কাস্টমস স্টেশনের মধ্যে এমন প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব দেশের প্রধান এই সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারের ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে।
এ বছরের ২০ জানুয়ারি কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান এক চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ১.০৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। চিঠিতে বলা হয়, ৪৭৮ রোল ইন্ডিগো ফ্যাব্রিকের একটি ৪০ ফুটের কনটেইনার ইলেকট্রনিক নিলামে বিক্রি করা হয়েছিল। ক্রেতা এর সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করলেও কনটেইনারটি তাকে বুঝিয়ে দেওয়া যায়নি।
কাস্টমসের যুক্তি হলো, কাস্টমস আইন ২০২৩ অনুযায়ী আমদানি করা পণ্যের আইনি রক্ষক হিসেবে কনটেইনারের নিরাপদ সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের। তারা বলেছে, বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় না করে ক্রেতাকে টাকা ফেরত দিলে সরকারকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
এর জবাবে ২ জুলাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দেওয়া এক চিঠিতে আরও বড় পরিসরে অভিযোগ জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে বলা হয়, নিলামযোগ্য কনটেইনার ও অন্যান্য পরিত্যক্ত পণ্য মিলে ৯ হাজার টিইইউ-এর (বিশ ফুট সমতুল্য) বেশি কার্গো নিলাম বা নিষ্পত্তি করতে পারেনি কাস্টমস। আর এসব পরিত্যক্ত কনটেইনার এখন বন্দরের কনটেইনার ইয়ার্ডের মোট ধারণক্ষমতার প্রায় ২০–২২ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে।
সিপিএর মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইয়ার্ডের জায়গা দখল হয়ে থাকায় বন্দরের পরিচালনগত সক্ষমতা কমে গেছে। সেইসঙ্গে জাহাজের বার্থিং ও রপ্তানি পণ্য চালানে বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়া বিপজ্জনক কার্গো বা পণ্য থেকে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি চুরি ও চোরাচালানের পথও সুগম হয়েছে। তাই নিলামযোগ্য পণ্যের দ্রুত নিষ্পত্তি, আনুষ্ঠানিকভাবে কাস্টমসের কাছে এসব পণ্যের দায়িত্ব হস্তান্তর ও বন্দরের দাবিকৃত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য এনবিআরকে অনুরোধ জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর থেকে ২৫০টি কনটেইনার গায়েব হওয়ার খবর প্রত্যাখ্যান করে সোমবার একটি প্রতিবাদলিপিও ইস্যু করেছে সিপিএ। তারা এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা, অনুমাননির্ভর এবং ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছে। সিপিএ বলছে, ২৫০টি নয়, ২৪৭টি চালানের তালিকা দিয়েছিল কাস্টমস। এর মধ্যে বেশিরভাগ চালানই ইতোমধ্যে খালাস হয়ে গেছে, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) স্থানান্তর করা হয়েছে, অথবা সিপিএর ইয়ার্ডে সংরক্ষিত রয়েছে। তারা আরও দাবি করেছে, কাস্টমসের সরবরাহ করা বেশ কয়েকটি কনটেইনার নম্বর ও বিল অভ লেডিংয়ে ভুল ছিল। এ কারণে বাকি চালানগুলোর মিল পাওয়া যায়নি। সিপিএ আরও বলেছে, ‘কাগজপত্র অনুসারে’ চালানগুলো ইতিমধ্যেই কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক পত্রযোগাযোগের মাধ্যমে সংস্থাটিকে বিষয়টি অবহিতও করা হয়েছে।
অন্যদিকে সিপিএর ক্ষতিপূরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করে কাস্টমস বলছে, পরিত্যক্ত কার্গোর ব্যাপারে কোনো আদালতের মামলা বা অন্য কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা আছে কি না, তা যাচাই না করে সেগুলো নিলামে তোলা বা নষ্ট করা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র শরীফ আল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় পণ্য নিলামে তুললে সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি করা হতে পারে; কর্মকর্তারাও আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারেন। স্টোরেজ চার্জ বাবদ সিপিএর ৮–১০ হাজার কোটি টাকার দাবিও নাকচ করে দেন শরীফ। তিনি বলেন, কাস্টমসের কাছ থেকে এ ধরনের ব্যয় আদায় করার মতো আইনি বিধান বন্দর কর্তৃপক্ষের নেই। কারণ সিপিএ এমনিতেই আমদানিকৃত পণ্যের আইনি রক্ষক।
সিপিএর সাবেক সদস্য জাফর আলম বলেন, যদি কোনো কনটেইনার নিখোঁজ হয়েই থাকে, তাহলে তার দায় শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর চাপানো উচিত নয়। তিনি বলেন, কার্গো ছাড় করার প্রক্রিয়ায় কাস্টমস কর্মকর্তা ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও জড়িত থাকে। জাফর আলম আরও বলেন, কনটেইনারগুলো কখন বন্দর এলাকা থেকে বের হয়েছে এবং কে এগুলো ছাড় করার অনুমতি দিয়েছে, তা বন্দরের সিসিটিভি সিস্টেম ব্যবহার করেই নির্ধারণ করা সম্ভব। সেইসঙ্গে বন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং কার্গো চুরি রোধে কিউআর কোড বা বারকোড-ভিত্তিক রিলিজ অর্ডার ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
ব্যবসায়ী নেতারাও এ ঘটনার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম চেম্বার অভ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক এই বিরোধকে নিছক পাল্টাপাল্টি দোষারোপের পর্যায়ে না নিয়ে গিয়ে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বন্দরের কাজের গতি বাড়াতে, ব্যবসায়ীদের সময়ক্ষেপণ কমাতে ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সিপিএ ও কাস্টমসের মধ্যে আরও জোরালো সমন্বয় থাকা অপরিহার্য।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category