• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন
Headline
বাবা ও স্ত্রীর জানাজায় মোজতবার অনুপস্থিতি নিয়ে আবারও গুঞ্জন, বাড়ছে উদ্বেগ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৩৫, পৌঁছাতে পারে ১০ হাজার থেকে ১ লাখে যুদ্ধবিরতির আট মাস পরও গাজায় পড়ে আছে মরদেহ, শিশুদের কামড়াচ্ছে ইঁদুর লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোমে খামেনির জানাজা সম্পন্ন ইন্দোনেশিয়াকে ‘অস্ত্র’, ‘ব্রহ্মোস’ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে ভারত পুতিন-জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপ: ইউক্রেন যুদ্ধ সমাধানের খুব কাছাকাছি, বললেন ট্রাম্প পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধাঁর মুখোমুখি বাংলাদেশের তদন্তকারীরা সুদ ব্যবধানে ধাক্কা খাবে দেশের এসএমই খাত উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত ইস্পাত উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে চীনের পোশাক বাজারের অংশীদারিত্ব দখল করছে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম: র‍্যাপিড

পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধাঁর মুখোমুখি বাংলাদেশের তদন্তকারীরা

Reporter Name / ৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া শত শত কোটি ডলার ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় নেমে তদন্তকারীরা এক জটিল আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধাঁর মুখোমুখি হচ্ছেন। অবৈধ সম্পদের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পূর্ণ গোপন করতে অর্থ পাচারকারীরা অত্যন্ত জটিল এবং ‘বহু-স্তরের’ (মাল্টি-লেয়ার্ড) কৌশল ব্যবহার করছে, যা ভেদ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও কর কর্তৃপক্ষ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো পাচার হওয়া অর্থের প্রাথমিক বহির্গমন পথ বা প্রথমে যে দেশে গেছে সেটি আংশিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে, কিন্তু সেই অর্থ প্রায়শই তৃতীয় বা চতুর্থ দেশের পৌঁছানোর পর তদন্তের খেই হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে পাচারকৃত সম্পদ ঠিক কোন দেশে জমা আছে, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এই পুঁজি পাচারের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক। অর্থনীতির ওপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়, এই বিপুল অর্থ পাচারের কারণে দেশে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর আদায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, বাণিজ্যে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম অর্থ পাচারের বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই সংকটের গভীরতা ও আইনি চ্যালেঞ্জের চিত্রটি সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ‘মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত ওয়ার্কিং কমিটি’র ২৮তম সভার কার্যবিবরণীতে বিশদভাবে ফুটে উঠেছে। গত ২১ মে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে অবৈধ আর্থিক প্রবাহের পরিধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করছে বিএফআইইউ। সংস্থাটি এপর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাইপ্রাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত, লুক্সেমবার্গ এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে অর্থ পাচারের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।
এছাড়াও বিএফআইইউ-এর তদন্তে আইল অব ম্যান, জার্সি, গুয়ের্নসি ও ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস-সহ বেশ কয়েকটি অফশোর কর স্বর্গ এবং যুক্তরাজ্যের অধীন বৈদেশিক ভূখণ্ডেও পাচার হওয়া তহবিলের সন্ধান মিলেছে।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের মতে, পুঁজি পাচারের প্রাথমিক পথ বা দেশ চিহ্নিত করা কেবল প্রথম ধাপ। আসল বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় সম্পদ পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে। পাচারকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে শেল কোম্পানি (নামসর্বস্ব ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান), অফশোর অ্যাকাউন্ট এবং জটিল লেয়ারিং বা স্তরায়ন কৌশল ব্যবহার করে এক দেশের অর্থ অন্য একাধিক দেশে ক্রমাগত স্থানান্তর করছে। এর ফলে কাগজের বা নথির সূত্রগুলো যেমন ছিন্ন হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার ঘাটতিকেও তারা সফলভাবে অপব্যবহার করছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, গত কয়েক বছরে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি নির্মম সত্য সামনে এসেছে— আর তা হলো, বিদেশের যেসব অ্যাকাউন্টে পাচারকৃত অর্থ জমা হয়েছে, তার সিংহভাগের কোনো হালনাগাদ তথ্যই বাংলাদেশের কাছে নেই।
“তাছাড়া, যেসব অ্যাকাউন্টের বিবরণ কোনোভাবে পাওয়া গেছে, সেখানে গিয়ে দেখা গেছে এখন আর কোনো অর্থ নেই। সেই অর্থ ইতোমধ্যে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে—যাদের তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলো প্রকাশ করতে রাজি হয়নি,” বলেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এই প্রক্রিয়ার জটিলতা তুলে ধরে বলেন, “আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তথ্য পাওয়া স্বভাবতই অত্যন্ত কঠিন। এর প্রধান কারণ হলো, যেসব দেশে অর্থ পাচার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এখনো তথ্য আদান-প্রদানের কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই। তার ওপর, এই অর্থ এক জায়গায় স্থির না রেখে প্রায়ই তৃতীয়, চতুর্থ বা এমনকি পঞ্চম কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে,” যোগ করেন তিনি। আহসান মনসুর আরও বলেন যে, মূল অপরাধীদের খুঁজে বের করা বা আইনের আওতায় আনাও সমান চ্যালেঞ্জিং, কারণ তাদের বেশিরভাগই এখন আর বাংলাদেশে অবস্থান করছেন না। তিনি বলেন, “যদিও বেশ কয়েকটি ব্যাংক ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করে কারা অর্থ পাচার করেছে তা সফলভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে, কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই আমাদের একটি দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে: আন্তর্জাতিক উৎস থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা এবং একই সাথে অর্থ পাচারকারীদের দেশে ফিরিয়ে এনে গ্রেপ্তারের জন্য নতুন করে ফৌজদারি মামলা শুরু করা।”
গত ২১ মে’র বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি জানান, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ (এমএলএআর) বা পারস্পরিক আইনি সহায়তা অনুরোধ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হলো সংশ্লিষ্ট দেশের কঠোর আইনি প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ করতে না পারা।
এই আন্তর্জাতিক বাধা মোকাবিলায় ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি এমএলএআর প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উচিত বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর সাথে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করা। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী মিশন (দূতাবাস) এবং এমএলএআর গ্রহণকারী দেশগুলোর আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও নিবিড় ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক বাধা মোকাবিলায় ওয়ার্কিং কমিটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, দীর্ঘমেয়াদি এমএলএআর প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের উচিত বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর সাথে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করা। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস এবং এমএলএআর গ্রহণকারী দেশগুলোর আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও নিবিড় ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স বর্তমানে এই প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করছে। এই টাস্কফোর্সে বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় রয়েছে। বিএফআইইউ অবৈধ আর্থিক প্রবাহের উৎস সন্ধান করে তা প্রমাণসহ টাস্কফোর্সের কাছে উপস্থাপনের মূল দায়িত্বে রয়েছে।
সরকার পাচার হওয়া সম্পদের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্পরিক আইনি সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় নীতিগতভাবে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক আইন আইন অনুযায়ী সহযোগিতা করার আগ্রহ দেখিয়েছে।
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে অর্থ পাচারের ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলার তদন্ত ও অর্থ উদ্ধার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রতিটি সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় অব্যাহত রয়েছে।
সরকারের সূত্রগুলো বলছে, এসব মামলায় শুধু বিদেশে অর্থের অবস্থান শনাক্ত নয়, বরং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি—উভয় ধরনের আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্পদ উদ্ধারের কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন যে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অর্থ পাচারের অভিযোগে ১৪২টি মামলা হয়েছে, ১৫টি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ৬টি মামলায় রায় হয়েছে। গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদেশে অবৈধভাবে পাচার হওয়া অর্থ সরাসরি দেশে ফেরত আনার বিষয়ে, বাংলাদেশ এখনো কোনো দেশের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেনি। তিনি জানান, তবে প্রাথমিকভাবে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত ১০টি দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (পারস্পরিক আইনি সহায়তা) চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশগুলো হলো—কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউএই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও হংকং। “এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং সুইজারল্যান্ড সরাসরি চুক্তির বদলে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং কেস-বাই-কেস বিশেষ চুক্তির মতো বিকল্প আইনি পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছে।”
মন্ত্রী আরও জানান, অর্থ পাচারের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে আরও বেশ কিছু দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে তাদের সঙ্গেও পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি করার পরিকল্পনা করছে। ফৌজদারি কার্যধারার পাশাপাশি সরকার দেওয়ানি আইনি প্রক্রিয়াকেও বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতায়, বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের কারণে খেলাপি ঋণে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়া দেশের প্রায় ৩০টি ব্যাংক ৯টি শীর্ষ আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাকে (ল ফার্ম) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই আন্তর্জাতিক ফার্মগুলোকে চুক্তির অধীনে ‘নো-উইন, নো-ফি’ (অর্থ পুনরুদ্ধার বা সফল হলেই কেবল ফি দেওয়া হবে) ভিত্তিতে বিদেশের মাটিতে বকেয়া ঋণের পাচারকৃত সম্পদ অনুসন্ধান ও পুনরুদ্ধারের কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে।
ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ভার্চুয়াল সম্পদ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্রমবর্ধমান অপব্যবহার নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভায় সিআইডির একজন প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিষিদ্ধ হলেও ভার্চুয়াল লেনদেনে এর ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। যার বড় অংশই ব্যবহৃত হচ্ছে অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অবৈধ লেনদেনের সুবিধার্থে। ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত তদন্ত ক্ষমতা বাড়াতে বিএফআইইউ, সিআইডি ও দুদকের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি।
এসব প্রস্তুতি মূলত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং’ (এপিজি)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আসন্ন পারস্পরিক মূল্যায়নকে সামনে রেখে নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সাথে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও কার্যক্রম সুবিন্যস্ত করতে কমিটি একটি লিড এজেন্সি, একজন টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর এবং সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার জন্য নির্দিষ্ট ফোকাল পারসন নিয়োগেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থ পাচার প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিদেশ থেকে অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধার করা একটি অত্যন্ত জটিল, দশকব্যাপী দীর্ঘ ও বেশ ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, যার ঐতিহাসিক সাফল্যের হারও বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত কম।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের এই সাম্প্রতিক সমন্বিত উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে এই প্রক্রিয়ায় হাত না দেওয়ার পেছনে নীতিগত অবহেলা ছাড়াও কারিগরি জ্ঞানের চরম ঘাটতি এবং পাচারকারীদের আধুনিক লেয়ারিং বা স্তরায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে দুর্বল ধারণার প্রতিফলন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্য পাওয়ার আইনি পথ সহজ করতে ‘বেনিফিসিয়াল ওনারশিপ ট্রান্সপারেন্সি’ (প্রকৃত মালিকানার স্বচ্ছতা) আইন প্রণয়ন করতে বা আন্তর্জাতিক ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ (সিআরএস)-এ যোগ দিতে বিগত সরকারগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা ও অনীহারও সমালোচনা করেন টিআইবি প্রধান। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন যে, দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধারণত চুরি হওয়া বা পাচার হওয়া সম্পদের মাত্র একটি খুব ছোট অংশই শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়; সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, নতুন করে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা অর্থ পাচার শুরুতেই কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা অনেক বেশি দ্রুতগতির, কম ব্যয়বহুল এবং সামগ্রিকভাবে বহু গুণ বেশি কার্যকর কৌশল।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category