……………….মীর আব্দুল আলীম………………….
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সাম্প্রতিক একটি ঘোষণা দেশের গণমাধ্যম ও সচেতন মহলে নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। মন্ত্রী জাতীয় সংসদে স্পষ্ট করে বলেছেন, ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধন করে আইনজীবীদের সংগঠন ‘বার কাউন্সিল’-এর মতো সাংবাদিকদের জন্যও একটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধন বা লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে মোবাইল জার্নালিজমের নামে অপেশাদার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর হস্তে দমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রীদের এমন সদিচ্ছাকে অবশ্যই স্বাগত জানানো যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে ব্যাধি আজ দেশের সংবাদমাধ্যমকে গ্রাস করেছে, তা কেবল একটি আইন সংশোধন বা নিবন্ধন দিয়ে কতটা নিরাময় সম্ভব? বর্তমান বাস্তবতায় ঘরে ঘরে এখন ‘সাংবাদিক’ নামধারী সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য। তথাকথিত ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ পত্রিকা ছাপিয়ে কিংবা একটি ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে গলায় কার্ড ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো এবং ‘বগল সম্পাদক’ যারা আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার ছাপিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে সুবিধা আদায় করে এসকল সুযোগসন্ধানীদের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকতা আজ কোণঠাসা। সাংবাদিকতার মর্যাদা যেখানে আজ তলানিতে ঠেকেছে, সেখানে এই মহান পেশার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র, প্রেস কাউন্সিল এবং প্রকৃত পেশাদারদের সম্মিলিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
নিচে সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যৌক্তিক ও তথ্যবহুল বিষয় আলোকপাত করা হলো:
১. অতীত ও বর্তমান সাংবাদিকতার রূপান্তর: আদর্শ বনাম বাণিজ্যিকীকরণ
এক সময় সাংবাদিকতা ছিল একটি ব্রত বা ‘মিশন’। সেখানে অর্থের চেয়ে সত্যনিষ্ঠা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা বড় ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারে সাংবাদিকতা অনেকের কাছে ‘পেশা’ বা ‘ব্যবসা’ ছাড়িয়ে ‘হাতিয়ারে’ পরিণত হয়েছে। অতীতে সম্পাদকদের সামাজিক যে সমীহ ছিল, তা আজ কতিপয় নামসর্বস্ব গণমাধ্যমের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ।
২. ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের যৌক্তিকতা
আইনজীবী, চিকিৎসক বা প্রকৌশলীদের মতো সাংবাদিকতায় প্রবেশের জন্যও একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত ও পেশাদার মানদণ্ড থাকা জরুরি। প্রেস কাউন্সিল আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই বিষয়টি থাকা অত্যন্ত ইতিবাচক, যা যত্রতত্র অযোগ্য লোকের অনুপ্রবেশ ঠেকাবে।
৩. ‘বার কাউন্সিল’ আদলে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা
আইনজীবীদের যেমন ওকালতি করতে সনদের প্রয়োজন হয়, সাংবাদিকদের জন্যও একটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মাধ্যমে ‘সাংবাদিকতা সনদ’ বা লাইসেন্সিং প্রথা চালু করা সময়ের দাবি। এতে করে আন্ডারগ্রাউন্ড বা ভুঁইফোড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা সহজে নিজেদের সাংবাদিক দাবি করতে পারবে না।
৪. ‘বগল সম্পাদক’ ও আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার দৌরাত্ম্য বন্ধ
সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদেরগনি চৌধুরীর ভাষায় ‘বগল সম্পাদক’—অর্থাৎ যারা ডিক্লারেশন বা অনুমোদনহীন পত্রিকা বগলে নিয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতে ঘোরে, তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। এই অপশক্তিকে রুখতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।
৫. মোবাইল জার্নালিজম (MoJo) ও সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার রোধ
মোবাইল জার্নালিজম বিশ্বজুড়ে একটি আধুনিক মাধ্যম হলেও বাংলাদেশে একে অপেশাদার ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। অনুমোদনহীন পোর্টাল বা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো ও অনৈতিক সুবিধা আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
৬. অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে সাংবাদিকতার ব্যবহার বন্ধ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ যথার্থই বলেছেন, “অপসংবাদিকতা রোধ না করলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া কঠিন।” সংবাদপত্রের নাম ভাঙিয়ে যারা চাঁদাবাজি, ভূমি দখল বা মানুষকে হয়রানি করছে, তাদের সাধারণ অপরাধী হিসেবে গণ্য করে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৭. হলুদ সাংবাদিকতা ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও নীতি-নৈতিকতাবিরোধী সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই বিধানটি কার্যকর হলে কোনো প্রমাণ ছাড়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারও চরিত্রহনন করার প্রবণতা কমে আসবে।
৮. ওয়েজ বোর্ড ও সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
তথ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত পত্রিকার সংখ্যা ৩ হাজার ৩৩৮টি। কিন্তু এর সিংহভাগেই নবম সংবাদপত্র মজুরি বোর্ড (ওয়েজ বোর্ড) পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পেটের তাগিদে অনেক সময় মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অনৈতিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাই মর্যাদাপূর্ণ সাংবাদিকতার জন্য আগে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে।
৯. প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতায়ন ও স্বায়ত্তশাসন
বর্তমানে প্রেস কাউন্সিল কেবল সতর্ক, ভর্ৎসনা ও তিরস্কারের মাধ্যমে রায় দিতে পারে। তাই ১৯৭৪ সালের আইনকে কেবল যুগোপযোগী করলেই হবে না, কাউন্সিলকে আর্থিক জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো স্বাধীন ও শক্তিশালী সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
১০. সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কঠোর ভূমিকা
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের সম্মান ও পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সর্বাগ্রে ভেতর থেকেই শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। পেশাদার সাংবাদিকদের মূল সংগঠনগুলোকে নিজস্ব দায়বদ্ধতা থেকে অপসংবাদিকদের চিহ্নিত ও প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকতার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং ভুঁইফোড়দের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান এখন সময়ের দাবি। পেশাদার সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোকে দলমত নির্বিশেষে অপসংবাদিকদের বহিষ্কার ও প্রতিরোধ করতে হবে।
১১. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কঠোর নজরদারি
অপসংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শিকার গ্রামীণ জনপদ। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডিসি-এসপিদের সহযোগিতায় প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সমন্বিত মনিটরিং সেল থাকা উচিত, যা স্থানীয় ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের কার্ড ও পরিচয়পত্র যাচাই করবে।
১২. কর্পোরেট ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা
আজকের দিনে অনেক বড় পুঁজির মালিক নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে বা প্রভাব খাটাতে গণমাধ্যমের লাইসেন্স নেন। এই কর্পোরেট ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে কেবল ছোটখাটো ‘বগল সম্পাদক’ ধরে সাংবাদিকতার মান ফেরানো যাবে না।
১৩. প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশা ত্যাগের ঝুঁকি হ্রাস
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসানের আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে- ভালো ও সৎ মানুষ এবং প্রকৃত সাংবাদিকেরা এই নোংরা পরিবেশের কারণে পেশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। মেধা ও সততার মূল্যায়ন না হলে অচিরেই চতুর্থ স্তম্ভ ধসে পড়বে।
১৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভারসাম্য
অপসংবাদিকতা দমনের নামে যেন আবার স্বাধীন সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখা বন্ধ না করে। আইন এমন হতে হবে যা অপরাধীকে শাস্তি দেবে, কিন্তু সত্য প্রকাশে পেশাদার সাংবাদিককে শতভাগ সুরক্ষা দেবে।
১৫. পাঠক ও দর্শকের সচেতনতা বৃদ্ধি
সবশেষে, নাগরিক সমাজকেও সচেতন হতে হবে। ফেসবুক বা ইউটিউবে চটকদার থাম্বনেইল বা লাইভ দেখলেই তা বিশ্বাস করা এবং শেয়ার করা বন্ধ করতে হবে। ভুয়া ও মূলধারার খবরের পার্থক্য বুঝতে পারলে অপসংবাদিকদের দর্শক-পাঠক কমবে, ফলে তাদের বাজারও সংকুচিত হবে।
উপসংহার: সাংবাদিকতা সমাজের দর্পণ এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। দর্পণ যদি ধূলিধূসরিত বা ভাঙা হয়, তবে রাষ্ট্রের আসল চেহারা চেনা দায় হয়ে পড়ে। তথ্যমন্ত্রীর এই সদিচ্ছা যেন কেবল কাগজে-কলমে বা কোনো বিশেষ মহলকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাষ্ট্রের প্রধান করণীয় হলো- অবিলম্বে প্রকৃত অংশীজনদের (প্রবীণ সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ) নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা। এই কমিশনের অধীনেই বার কাউন্সিলের মতো একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ‘জাতীয় সাংবাদিক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ’ গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনা সরিয়ে রেখে কেবল মেধা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে এই পেশার লাইসেন্স বা স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। একই সাথে, তথাকথিত আন্ডারগ্রাউন্ড ও অনুমোদনহীন পোর্টালগুলোর ডিক্লারেশন স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে। রাষ্ট্র যদি আজ এই কঠোর ও সাহসী পদক্ষেপ না নেয়, তবে অপসংবাদিকতার করাল গ্রাসে প্রকৃত সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকতা অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।
(এই বিভাগের প্রতিটি লেখা লেখকের বাক স্বাধীনতার প্রতিফলন। এ লেখার দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এর জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। )