• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ন
Headline
বাবা ও স্ত্রীর জানাজায় মোজতবার অনুপস্থিতি নিয়ে আবারও গুঞ্জন, বাড়ছে উদ্বেগ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প: মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৩৫, পৌঁছাতে পারে ১০ হাজার থেকে ১ লাখে যুদ্ধবিরতির আট মাস পরও গাজায় পড়ে আছে মরদেহ, শিশুদের কামড়াচ্ছে ইঁদুর লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোমে খামেনির জানাজা সম্পন্ন ইন্দোনেশিয়াকে ‘অস্ত্র’, ‘ব্রহ্মোস’ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে ভারত পুতিন-জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপ: ইউক্রেন যুদ্ধ সমাধানের খুব কাছাকাছি, বললেন ট্রাম্প পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধাঁর মুখোমুখি বাংলাদেশের তদন্তকারীরা সুদ ব্যবধানে ধাক্কা খাবে দেশের এসএমই খাত উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত ইস্পাত উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে চীনের পোশাক বাজারের অংশীদারিত্ব দখল করছে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম: র‍্যাপিড

উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত ইস্পাত উৎপাদনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে

Reporter Name / ৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বহুতল ভবনের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে দেশে শক্তিশালী ও টেকসই নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। এর ফলে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত অগ্রযাত্রা শুধু দেশের চেহারাই বদলাচ্ছে না, ইস্পাতশিল্পের ভবিষ্যৎও নতুনভাবে নির্ধারণ করছে। প্রকৌশলী ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন শুধু বেশি পরিমাণে ইস্পাত উৎপাদনের দিকে নয়, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও মানসম্মত ইস্পাত উৎপাদনের দিকেও ধীরে ধীরে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৮০ লাখ টন ইস্পাত ব্যবহার হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত হয়। কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের ফলে এ খাতে আমদানি করা প্রস্তুত ইস্পাতের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
বিশ্বজুড়েই ইস্পাত উৎপাদনে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসছে। ওয়ার্ল্ড স্টিল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্ন উৎপাদন, পুনর্ব্যবহার বৃদ্ধি এবং উন্নতমানের ইস্পাত উৎপাদনে গুরুত্ব বাড়ায় বিভিন্ন দেশে ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের ব্যবহার বাড়ছে।
প্রচলিত ইন্ডাকশন ফার্নেসের তুলনায় আধুনিক ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের সঙ্গে ল্যাডল রিফাইনিং ফার্নেস ব্যবহার করলে ইস্পাতের রাসায়নিক গঠন আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, অশুদ্ধতা দূর করা যায় এবং তুলনামূলকভাবে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মানের ইস্পাত উৎপাদন সম্ভব হয়।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেতু, বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বহুতল ভবনের মতো অবকাঠামোর জন্য এ ধরনের গুণগত মানের ইস্পাতের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে।
দ্রুত সম্প্রসারণ সত্ত্বেও বাংলাদেশে রড উৎপাদনের বড় অংশ এখনও ইন্ডাকশন ফার্নেস প্রযুক্তিনির্ভর, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোতে। কম বিনিয়োগে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকায় এ প্রযুক্তি দেশীয় ইস্পাতশিল্প গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। তবে প্রকৌশলীরা বলছেন, ভবিষ্যতের অবকাঠামোর জন্য আরও উন্নত রিফাইনিং এবং শক্তিশালী মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, উচ্চ গ্রেডের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করলে কাঠামোগত দক্ষতা ও টেকসইতা—দুই-ই বাড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, রডের গ্রেড-৪০০ থেকে গ্রেড-৫০০-এ উন্নীত করা এবং কংক্রিটের শক্তি ৩০ মেগাপ্যাস্কেল থেকে ৬০ মেগাপ্যাস্কেলে বাড়ানো গেলে নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করেই কাঠামোর ওজন প্রায় ২৮ শতাংশ কমানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে ইস্পাত ও সিমেন্টের বড় অবদান রয়েছে। তাই শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে এগোতে হলে বাংলাদেশের জন্য পরিচ্ছন্ন ইস্পাত উৎপাদন প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ শুরু করেছে।
আবুল খায়ের স্টিল ২০১৫ সালে দেশের প্রথমদিকের ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস স্থাপন করে। এরপর ২০২০ সালে সীতাকুণ্ডে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রকল্প চালু করে জিপিএইচ ইস্পাত। অন্যদিকে বিএসআরএম ও কেএসআরএম স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চমানের ইস্পাত উৎপাদন লাইনে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করছে।
উৎপাদকদের মতে, এসব বিনিয়োগের ফলে পণ্যের মানে ধারাবাহিকতা আসে, জ্বালানি ব্যবহার কমে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ে। কারণ, রপ্তানি বাজারে ক্রেতারা এখন ক্রমেই মানসনদপ্রাপ্ত ও পরিবেশসম্মত পণ্যের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এখন আর শুধু প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠছে।
দেশের নির্মাণ ইস্পাতের বড় ভোক্তা আবাসন খাতও উচ্চমানের নির্মাণসামগ্রীর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নগর এলাকায় ভবন ক্রমেই উঁচু ও প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হওয়ায় মানসম্মত ইস্পাতের চাহিদা বাড়ছে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলী আফজাল বলেন, আবাসন উদ্যোক্তারা এখন স্বল্পমেয়াদি ব্যয়ের চেয়ে কাঠামোর স্থায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “ভবনগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহারের উপযোগী হতে হবে। বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় ভূমিকম্প-সহনশীলতা অবশ্যই অগ্রাধিকার পেতে হবে।”
আলী আফজাল আরও বলেন, “এখন বড় নির্মাণ প্রকল্পে ধাপে ধাপে পরিশোধিত ও উচ্চমানের ইস্পাতের বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করার সময় এসেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের বিস্তৃত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণসামগ্রীর মান আরও শক্তিশালী করা হলে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং দেশের আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও নিশ্চিত হবে।
নির্মাণ প্রকৌশলীরা বলছেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিল্ডিং কোড ও নির্মাণচর্চাও হালনাগাদ বা আধুনিক করা প্রয়োজন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের চাহিদাই শেষ পর্যন্ত ইস্পাতশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তিনি বলেন, “পরিশোধিত ও উচ্চমানের ইস্পাতের চাহিদা বাড়লে উৎপাদকেরা স্বাভাবিকভাবেই তা উৎপাদনে বিনিয়োগ করবেন।” তিনি জানান, সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে ইস্পাতের বড় ব্যবহার রয়েছে। উৎপাদকেরা বর্তমানে গ্রেড-৭০০ পর্যন্ত রড উৎপাদনে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রেড-৫০০ রড ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “সবুজ ও উন্নত নির্মাণপ্রযুক্তির জন্য আমরা ধীরে ধীরে প্রকৌশলের লোকজনকেও প্রস্তুত করছি।”
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে ইস্পাত অপরিহার্য থাকবে। তবে আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি ও পুনর্ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে এ শিল্পের পরিবেশগত প্রভাব কমাতে হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ইস্পাতশিল্প আধুনিকায়নে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সহায়ক শিল্পনীতি প্রয়োজন।
প্রচলিত মেল্টিং প্রযুক্তির তুলনায় ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস প্রকল্পে মূলধনী ব্যয় অনেক বেশি। তাই এ প্রযুক্তির বিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সুবিধা জরুরি।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান বলেন, পরিচ্ছন্ন ইস্পাত উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের এখন একটি জাতীয় রোডম্যাপ প্রয়োজন।তিনি বলেন, “২০৩০ বা ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ইস্পাতশিল্প কীভাবে আরও পরিচ্ছন্ন, স্মার্ট, নিরাপদ ও সহনশীল হবে—তা নির্ধারণ করা উচিত।” তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, স্ক্র্যাপ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন বা ইএসজি মানদণ্ড গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং উদীয়মান গ্রিন স্টিল বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category