• শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ০৫:০৬ অপরাহ্ন
Headline
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি এলাকাবাসীসহ গোটা দেশের মানুষের ব্যাঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির উত্থানে গভীর উদ্বেগে দিন কাটছে দিপকের বাবা-মা’র ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ হোয়াটসঅ্যাপের কল রেকর্ড করার গোপন ট্রিকস সাইবার হামলা ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের নতুন ডিভাইস ‘সাইলেন্টগ্লাস’ মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য: যুদ্ধের ধাক্কা দ্রুতই সামলে উঠেছে ইরান, ড্রোনও বানাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনে ভুয়া নোটিফিকেশন, সর্বস্ব হাতিয়ে নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা ‘“ডোনাল্ড ট্রাম্প” কোরবানি হচ্ছে বাংলাদেশে’, টেলিগ্রাফের খবর কখনো মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কখনো প্রভাবশালীর আত্মীয় পরিচয়ে প্রতারণা, দুজন গ্রেপ্তার পেট্রলপাম্পের ওয়াশরুমে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা ফারিনের

কোরবানির পশুর চামড়া ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

…………………ড. খান মোহম্মদ ইসরাফিল………………………

আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সরকার একাধিক বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চামড়াশিল্পের দীর্ঘদিনের আর্থিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের শর্ত শিথিল করে সহজ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে, ফলে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা আগের চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারছেন। পাশাপাশি সাভারের চামড়া শিল্পনগরী সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সংস্কার ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে। আর্থিক প্রণোদনা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের এই সমন্বিত পদক্ষেপ চামড়াশিল্পকে আরো টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার পথে এগিয়ে নিচ্ছে।
উপসংহারে বলা যায়, সঠিক নীতি প্রণয়ন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প আবারও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে কোরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দরিদ্র মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং ধর্মীয় আমানতের যথাযথ বাস্তবায়নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। এ লক্ষ্যে সরকারকে মাঠপর্যায়ে মূল্য তদারকি জোরদার, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং ট্যানারি শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও এতিমখানাভিত্তিক সংগ্রাহকদের সহজ ঋণ ও প্রশিক্ষণসুবিধা প্রদান করা হলে চামড়া খাত আরো টেকসই ও লাভজনক হয়ে উঠবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি কোরবানির প্রকৃত সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্যও বাস্তব রূপ পাবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোরবানির চামড়া একটি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস হলেও বাস্তবে এটি একটি সংকটে পরিণত হয়েছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি পশু কোরবানি হয়, যার অর্ধেকেরও বেশি গরু। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণের ফলে এবারের ঈদে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ বেশি পশুর সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে, যা বাজারে কোরবানির পশুর সংকট এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই অতিরিক্ত সরবরাহ পশুর মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হলেও চামড়া ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই বিপুল পরিমাণ পশু থেকে উৎপন্ন কাঁচা চামড়ার সম্ভাব্য বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এই খাত থেকে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থনীতিতে অবদার রাখতে পারে। এবারের ঈদুল আজহায় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো, প্রথম বারের মতো তৃণমূল পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ চামড়ার গুণমান রক্ষায় যুগান্তকারী ভ‚মিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে তুরস্ক, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে কোরবানির চামড়ার মূল্য কম, কারণ এসব দেশে চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা বেশি সুসংগঠিত। তবে বাংলাদেশ সরকার চামড়াশিল্পের আধুনিকায়ন, রপ্তানি সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে ঈঊঞচ সংস্কারের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করে আন্তর্জাতিক মান পূরণ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।
সরকারের পাশাপাশি দেশের আর্থিক খাতও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ গ্রহণের শর্ত শিথিল করেছে, যাতে তৃণমূল পর্যায়ে সহজ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা যায়। এর ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ী, চামড়া সংগ্রহকারী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজে কার্যকর মূলধন পাচ্ছেন, যা সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরো গতিশীল করছে। প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ চামড়া আগে নষ্ট হয়ে গেলেও এখন এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কুরআনে কোরবানির নির্দেশনা স্পষ্টভাবে এসেছে এবং রসুলুল্লাহ (স.) কোরবানি করার প্রতি সামর্থ্যবানদের কঠোরভাবে উৎসাহিত করেছেন। এটি শুধু ধর্মীয় ইবাদত নয়, বরং এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকও জড়িত, বিশেষ করে কোরবানির পশুর চামড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। শরিয়ত অনুযায়ী, এই চামড়া বিক্রি করে অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা বৈধ নয়; বরং তা গরিব-দুস্থ, এতিমখানা, মাদ্রাসা বা জনকল্যাণমূলক কাজে দান করতে হয় এবং কসাইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবেও তা দেওয়া নিষিদ্ধ। ফলে কোরবানির এই বিধান সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সামাজিক নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলে।
কোরবানির চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের দুর্বলতাও বড় সমস্যা হলেও বর্তমানে সরকার রপ্তানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা, করসুবিধা এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে ভর্তুকি প্রদান করছে। ফলে ট্যানারি শিল্পে আধুনিকায়নের গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ছে। সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, সংরক্ষণ ঘাটতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এখন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।
এই সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা অনেক। ইতালি, চীন ও ভারতের সফল মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশ যদি ফিনিশড লেদার ও ব্র্যান্ডেড পণ্যের দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে এই খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে। সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডিজাইনিং, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জন সহজ হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে চামড়া খাত একটি কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে সক্ষম, যা দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করবে। গ্রামাঞ্চলে দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে চামড়ার মান রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ার কারণে আগের তুলনায় অপচয়ও কমছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার অবস্থান পুনরুদ্ধারে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত সনদ অর্জন। ঈঊঞচ সংস্কার, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের জন্য শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি। এই সংকটের প্রভাব সামাজিক খাতেও পড়ছে, তবে সরকারি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হলে চামড়ার অর্থ সঠিকভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে, যা ইসলামি সমাজব্যবস্থার ন্যায়বিচার ও কল্যাণমূলক অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং চামড়াশিল্প জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হতে পারবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চামড়াশিল্পে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে ডিজিটালাইজেশন একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের চামড়া খাতে এখন ধীরে ধীরে একটি ডিজিটাল সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেখানে কোরবানির পশু জবাই থেকে শুরু করে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে প্রান্তিক উৎপাদকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও চামড়াশিল্পের ওপর পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং পরিবেশগত দূষণ চামড়া সংরক্ষণ ও মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা এবং টেকসই শিল্পনীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তরুণ জনগোষ্ঠীকে চামড়াশিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক

( মতামত পাতাটি বাক-স্বাধীনতার প্রতীক। এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও প্রতিটি শব্দকে আমরা সন্মান করি। কারো কারো কাছে লেখা নিয়ে দ্বিমত থাকতেও পারে তবে এর জন্য সম্পাদককে দায়ী করা যাবে না। )


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category