প্রভাত ডেস্ক: নীল সমুদ্র, পাহাড়ি গ্রাম, পাথুরে পথ আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য গ্রিসের সাইক্লাডেস দ্বীপপুঞ্জের সিফনোস এখন ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে নতুন আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একসময় তুলনামূলক নিরিবিলি থাকা এই দ্বীপ বর্তমানে পর্যটকদের নজর কাড়ছে। বিশেষ করে জনপ্রিয় দ্বীপ মাইকোনোস ও সান্তোরিনির ভিড় এড়িয়ে যারা অন্যরকম অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের কাছে।
সিফনোসের বিশেষত্ব শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নয়, এর সমৃদ্ধ খাবারের ঐতিহ্যেও। আধুনিক গ্রিক রান্নার অন্যতম পথিকৃৎ নিকোলাস ত্সেলেমেন্তেসের জন্ম এই দ্বীপে। তার রান্নার ধারণা আজও সিফনোসের খাদ্যসংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও গ্রামের রান্নাঘরগুলোতে ঐতিহ্যবাহী গ্রিক খাবারের সঙ্গে আধুনিক রান্নার কৌশলের মেলবন্ধন দেখা যায়।
প্রাচীনকাল থেকেই সিফনোস মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। বর্তমানে এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর। তাদের মধ্যে অন্যতম চতুর্থ প্রজন্মের মৃৎশিল্পী নিকোস লেম্বেসিস। আর্টেমনাস গ্রামের তাঁর পারিবারিক কর্মশালায় দেখা যায়, কীভাবে হাতে তৈরি মাটির পাত্র তৈরি হয় এবং পরিবারের সদস্যরা পুরোনো ফুল ও মাছের নকশায় প্লেট-কাপ সাজান।
দ্বীপে ঘুরতে গেলে থিওডোরু নামের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান থেকেও সংগ্রহ করা যায় ‘আমিগদালতা’ চিনি ছড়ানো বাদামের তৈরি জনপ্রিয় গ্রিক কুকি।
স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে যেতে পারেন মার্গারিটা নামের একটি সহজ-সরল তাভেরনায়। সেখানে পাওয়া যায় ‘মাস্তেলো’ ঐতিহ্যবাহী মাটির পাত্রে ধীরে রান্না করা ডিল পাতার সঙ্গে পরিবেশিত ছাগলের মাংস। জনপ্রতি খরচ প্রায় ২৮ ইউরো, তবে এতে ওয়াইন অন্তর্ভুক্ত নয়।
আর্টেমনাস বা অ্যাপোলোনিয়া থেকে প্রায় ২০ মিনিট বাসে পৌঁছানো যায় প্লাটিস জিয়ালোস সৈকতে। এটি সিফনোসের অন্যতম দীর্ঘ বালুকাবেলা। প্রশস্ত উপসাগরের পাশে রয়েছে অসংখ্য তাভেরনা ও বিচ বার।
দিনভর স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটার পর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায় পালমিরা বা লস্ট বে নামের বিচ বারে। দিনের শান্ত পরিবেশ রাতের দিকে বদলে যায় প্রাণবন্ত আড্ডায়। ডিজে সংগীত, ককটেল ও সমুদ্রের বাতাস মিলিয়ে তৈরি হয় বিশেষ আবহ।
লস্ট বে-এর ‘ডার্টি সিফনোসিয়ান মার্টিনি’ এবং পালমিরার ‘ডোলোরেস’ ককটেল পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়।
সিফনোসের খাবারের জগতে বিশেষ পরিচিত নাম ‘ওমেগা৩ ফিশ অ্যান্ড ওয়াইন বার’। শেফ জিওর্গোস সামোইলিস এই রেস্তোরাঁর মাধ্যমে দ্বীপের খাবারে নতুন মাত্রা যোগ করেন। সামুদ্রিক খাবারের আধুনিক পরিবেশনের জন্য জায়গাটি এখন পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য।
এখানে পাওয়া যায় সাদা গ্রুপার মাছের আগুয়াচিলে, ধীরে সংরক্ষিত অ্যাম্বারজ্যাক মাছের সাশিমি এবং ব্ল্যাক গার্লিক ও চিজ দিয়ে তৈরি বেকড স্ক্যালপ। এক গ্লাস গ্রিক সাদা ওয়াইনের সঙ্গে এই খাবারের স্বাদ নিতে জনপ্রতি খরচ হতে পারে প্রায় ৮৫ ইউরো।
অ্যাপোলোনিয়া থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার হাঁটার পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় প্যানাজিয়া ক্রিসোপিগি মঠে। সিফনোসের সবচেয়ে পরিচিত স্থাপত্যগুলোর একটি এটি। পাহাড়ি পথটি এগিয়ে যায় জলপাই বাগান, পাথরের দেয়াল ও ধাপে ধাপে তৈরি পাহাড়ি জমির মধ্য দিয়ে।
১৭ শতকের এই সাদা রঙের গির্জাটি ভার্জিন মেরির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, জলদস্যুদের হাত থেকে দ্বীপবাসীকে রক্ষা করতে মঠটি যে পাথরের ওপর তৈরি, সেই পাথর নাকি অলৌকিকভাবে ফেটে গিয়েছিল। মঠে প্রবেশের সময় পর্যটকদের শালীন পোশাক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়।
উপকূলীয় পথ ধরে প্রায় ২০ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় ফারোস নামের শান্ত মাছধরা গ্রামে। ১৮৮৩ সাল পর্যন্ত এটি ছিল সিফনোসের প্রধান বন্দর। এখান থেকে বাসে যাওয়া যায় কাস্ত্রোতে—দ্বীপের প্রাচীন রাজধানী।
১৪ শতকে নির্মিত কাস্ত্রো শহরের মধ্যযুগীয় দুর্গপ্রাচীর এখনো বেশ ভালোভাবে সংরক্ষিত। সরু পাথরের গলি, খিলানযুক্ত পথ এবং প্রাচীন পাথরের স্থাপত্য এই শহরকে দিয়েছে আলাদা আকর্ষণ। এখান থেকে নিচে নামলে দেখা মিলবে সমুদ্রের পাথুরে প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট নীল গম্বুজের ‘চার্চ অব দ্য সেভেন উইটনেসেস’।
সিফনোসের অন্যতম আলোচিত খাবারের জায়গা ‘ক্যান্টিনা’। শূন্য অপচয়ের নীতি এবং প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া সৃজনশীল খাবারের জন্য এটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়।
কাস্ত্রোর নিচে পাহাড়ের গায়ে, সমুদ্রের পাশে কয়েকটি পুরোনো জেলেদের ঘরকে রূপান্তর করে তৈরি হয়েছে এই ছোট্ট রেস্তোরাঁ। সেখানে যেতে হয় ১০০টির বেশি পাথরের সিঁড়ি ও কাঁচা পথ পেরিয়ে।
এখানে স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় বিশেষ টেস্টিং মেনু। খাবারে ব্যবহার করা হয় ফারমেন্টেশন, সংরক্ষণ ও ‘নোজ-টু-টেইল’ রান্নার কৌশল। মেনুতে থাকতে পারে মাটনের টার্টার, ডুমুর পাতার সস দিয়ে রান্না করা মাছ এবং ব্রাউন বাটার ও এপ্রিকট জ্যামের সঙ্গে তৈরি বিশেষ আইসক্রিম। জনপ্রতি খরচ শুরু প্রায় ৮০ ইউরো থেকে।
প্রকৃতি, ইতিহাস, মৃৎশিল্প ও অসাধারণ খাবারের সমন্বয়ে সিফনোস এখন গ্রিসের এমন এক গন্তব্য, যেখানে পুরোনো ঐতিহ্য আর আধুনিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা মিলেছে একসঙ্গে।