• বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ন
Headline

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন সমীকরণ

Reporter Name / ১২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

……………..ড. ফরিদুল আলম…………..

পশ্চিমবঙ্গে অভাবনীয় বিজয় পেয়েছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি। এই জয়ের পর তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বললেন, ‘বাংলায় পদ্ম ফুটেছে’। উল্লেখ্য পদ্মফুল হচ্ছে বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক।
ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রায় ৭৯ বছর সময় ধরে দেশটির ইতিহাস-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারক, অন্যতম বড় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ শাসিত হয়েছে মোটে তিনটি রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা।
কংগ্রেসের ৩০ বছর, বামফ্রন্টের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলের ১৫ বছর, এই তিন শক্তি তাদের মেয়াদে টানা রাজ্য শাসন করেছে। ভারতের অনেক রাজ্যের তুলনায় উদার, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অধিকার সচেতন এই রাজ্যে এবার এমনভাবে পরিবর্তনের পালে হাওয়া লাগল, এটা অনেকটা অবাক হওয়ার মতো বিষয়।
অবাক হওয়ার কথা বলা হচ্ছে এই কারণে যে একটা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল টানা তিন মেয়াদে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করে আসলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাদের সেরকম উজ্জ্বল কোনো উপস্থিতি ছিল না। আজ থেকে ১০ বছর আগে ২০১৬ সালে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪ আসনের মধ্যে মাত্র ৩টি আসন লাভ করা দলটি দ্রুতই তাদের শক্তির বিস্তার ঘটাতে থাকে এবং ২০২১ সালে তা ৭৭ আসনে উন্নীত হয়। এর ঠিক ৫ বছর পর আজকের এই দিনে এসে তারা সরকার গঠনের চেয়েও অনেক বেশি, দুই তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এবং এই নির্বাচনে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান অনেক পোক্ত হয়েছে, এমনটাও ধারণা করা যায়। বলে রাখা ভালো যে একই সময়ে ভারতের অপর ৫টি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিজেপি আসাম এবং কেন্দ্রশাসিত পদুচেরিতে জয়লাভ করেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য তামিলনাড়ুতে ক্ষমতাসীন ডিএমকে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে একসময়ের দক্ষিণী চলচ্চিত্রের অভিনেতা এবং কেবলমাত্র দুই বছর আগে নতুন দল (টিভিকে) গঠন করা থালাপতি বিজয়ের কাছে।
বিজেপি অনেকবছর চেষ্টা করেও সেখানে তাদের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। অপরদিকে কেরালায় ক্ষমতাসীন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টকে পরাজিত করে কংগ্রেস নিয়ন্ত্রিত ইউডিএফ বিজয় লাভ করেছে। এই হিসাবে বলা যেতে পারে যে, এই নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের চেয়ে এগিয়েই থাকল।
ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপির অবস্থান একধরনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বরাদ্দ ৪২ আসনের মধ্যে বিজেপি ১২টি আসন লাভ করেছিল, যা ২০১৯ সালের নির্বাচনের চেয়ে ৬টি কম।
নারী নিরাপত্তা সংক্রান্ত আরজিকর, সারদা, রোজভ্যালির মতো চিটফান্ড মামলা, সরকারি নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষকে অনেকটা তৃণমূল বিমুখ করে তোলে।
অন্যদিকে তৃণমূল আগেরবারের তুলনায় ৭টি আসন বেশি পেয়ে ২৯ আসন লাভ করে। দুই বছর সময়ের মধ্যে রাজ্যের শাসকদলের বিধানসভা নির্বাচনে এমন ধস বিজেপির প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আস্থা বৃদ্ধির দিকটিকে তুলে ধরেছে, যা সামনের লোকসভা নির্বাচনে একইভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। এই নির্বাচনের ফলাফলকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে অনেক কারণেই স্বাগত জানানো হয়নি। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ভোটার তালিকা সংশোধন। তৃণমূল অভিযোগ করছে পরিকল্পিতভাবে এটি করা হয়েছে, কিছু আসনকে চিহ্নিত করে, যেখানে এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
অপরদিকে তৃণমূলের পরাজয়ের বেশকিছু শক্ত কারণও রয়েছে, যার মধ্যে বহুল প্রচারিত হচ্ছে তাদের নারী ভোটার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া বলে অনেকে মনে করছে। তৃণমূল সরকার নারীদের উন্নয়নে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডারসহ সবুজ সাথী এবং স্বাস্থ্য সাথীর মতো কিছু জনপ্রিয় কর্মসূচি গ্রহণ করলেও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে নারীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি নিয়ে রাজ্যে ব্যাপকভাবে অসন্তোষ দেখা গেছে।
নারী নিরাপত্তা সংক্রান্ত আরজিকর, সারদা, রোজভ্যালির মতো চিটফান্ড মামলা, সরকারি নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষকে অনেকটা তৃণমূল বিমুখ করে তোলে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বরাবরের মতো এবারও বাংলাদেশ ইস্যু অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে, তবে এবারের নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে অতীতের তুলনায় বিজেপি এই ইস্যুটিকে খুবই সতর্কভাবে ব্যবহার করেছে।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে সংশোধিত ভোটার তালিকা এবং এর মধ্য দিয়ে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারকে বাদ দেয়া, যা বিজেপির পক্ষ থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া বলে প্রচার করা হয়েছে এবং এদের একটা বড় অংশ বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
এই ভোটারদের অন্ততপক্ষে ৬৫ শতাংশ তৃণমূলের ভোটার বলে জানা যায়। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের ভোট যেমন কমেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ প্রশ্নে ভোটারদের কাছে বিজেপির বার্তা অনেক স্পষ্ট হয়েছে। এই অবস্থার উত্তরণেও তাদের কিছু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বেশ কাজে দিয়েছে, যেমন অনুপ্রবেশ বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনের বিষয়সহ তরুণ এবং বেকারদের জন্য দ্রুত নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়গুলো ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ ঘিরে যে উত্তেজনা ছিল, নির্বাচনোত্তর সময়ে এটার কি প্রতিফলন দেখা যেতে পারে, সঙ্গত কারণেই এটা নিয়ে একটা বিশেষ আগ্রহ রয়েছে সবার। ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক গভীর, যার মূলে রয়েছে একই ভাষা এবং সংস্কৃতি এবং এর বাইরে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্তের প্রায় অর্ধেক পশ্চিমবঙ্গের সাথে থাকার কারণে যৌক্তিকভাবেই এই যোগাযোগ অনেকটাই নিবিড়। এতদিন ধরে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূলের শাসনামলের পর রাজ্যে বিজেপি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তব প্রতিফলন ঘটায়, তাহলে ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বলি হয়ে অনেকের বাংলাদেশে পুশব্যাক হওয়া লাগতে পারে।
তবে ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় নির্বাচনী ইশতেহার এবং বাস্তবে সরকার পরিচালনার মধ্যে অনেক তফাত থেকে যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান বিবেচনায় রাজ্য সরকারকে অনেক বাস্তবতা মেনে চলতে হবে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সম্মতিতে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া এই চুক্তিটি আর স্বাক্ষরিত হয়নি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অনাগ্রহের কারণে।
এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিজেপির জন্য সবচেয়ে সুবিধার জায়গাটি হচ্ছে তারাই কেন্দ্রের সরকারে রয়েছে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সম্মতিতে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া এই চুক্তিটি আর স্বাক্ষরিত হয়নি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অনাগ্রহের কারণে। পরবর্তীতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কেন্দ্রের একই অবস্থান থাকলেও মমতা তার অবস্থা পরিবর্তন করেননি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের জন্য নতুন এক দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকবছর ধরে ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গে তাদের কৌশলগত শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। এই করিডোরের সবচেয়ে চওড়া অংশটি ১৩ কিলোমিটার এবং এর পাশেই চীনের অবস্থান তাদের নিরাপত্তার জন্য নানা কারণেই নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। দেশটির উত্তর-পূর্বের ৭টি রাজ্যের রসদ সরবরাহ এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই করিডোরই একমাত্র ভরসা।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলে আসা দ্বিপাক্ষিক টানাপড়েনের বিষয়টি দিল্লিকে বিশেষভাবে ভাবাচ্ছে। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর ভারত সরকার এই টানাপড়েনের জায়গাটিকে মেরামত করতে উৎসাহী।
এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে তাদের দলের বিজয় দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে আরও শক্তভাবে সমাধানে কেন্দ্রীয় সরকারকে সাহায্য করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনী ফলাফলের পর আমাদের কূটনীতিতেও এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও মনোযোগের অবকাশ রয়েছে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকা পোসট-এর সৌজন্যে )


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category