• বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন
Headline
কর আপিলের জমার হার ব্যাপকভাবে কমানোর প্রস্তাব বাজেটে ব্যাংক খাতের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০.৮৭ লাখ কোটি টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার পরিমাণ বেড়েছে শিক্ষার্থীদের, শীর্ষে ৫ ব্যাংক ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের খবরে ৮০ ডলারের নিচে তেলের দাম প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান সীমান্তে তেল পাচার ইরানের পুনর্গঠনের জন্য তৈরি হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল ডিপসিকসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের কালো তালিকাভুক্তি স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লা ইস্যুতে ইসরায়েলকে নিন্দা, সিরিয়ার সহযোগিতা চাইলেন ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ড্রোন ও স্নাইপার হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার দাবি এফবিআইয়ের
বাংলাদেশ ব্যাংকের 'ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫'

ব্যাংক খাতের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০.৮৭ লাখ কোটি টাকায়

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি : দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০ টাকার মধ্যে প্রায় ৬ টাকাই এখন ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ ঋণে (ডিস্ট্রেসড লোন) পরিণত হয়েছে। গত ১৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ ঋণ ব্যাংক খাতের মোট বিতরণকৃত ১৮ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল এবং অবলোপনকৃত (রাইট-অফ) ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের মোট পরিমাণ ১০.৮৭ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অথচ, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোট দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ৭.৫৬ লাখ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা জানান, অতীতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে গোপন রাখা বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ ২০২৫ সালে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা এবং পুনঃতফসিল ও অবলোপনকৃত ঋণ বৃদ্ধি পাওয়াই এই রেকর্ড উল্লম্ফনের প্রধান কারণ। একই সময়ে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন ঘাটতিও মারাত্মকভাবে বেড়েছে।
সাধারণত যেসব ঋণের বিপরীতে গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ে আসল বা সুদ পরিশোধ করতে পারেন না এবং ব্যাংকগুলোর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়, সেগুলোকে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বলা হয়। খেলাপি ঋণের সঙ্গে পুনঃতফসিল ও অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের হিসাব করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা (যা ২০২৪ সালে ছিল ৩.৪৬ লাখ কোটি টাকা), পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ৪.৪৭ লাখ কোটি টাকা (যা ২০২৪ সালে ছিল ৩.৪৮ লাখ কোটি টাকা) এবং অবলোপনকৃত ঋণ ৮৩,৪৭৯ কোটি টাকা (যা ২০২৪ সালে ছিল ৬২,৩০০ কোটি টাকা)।
২০২৫ সালে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যাংক খাতের ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন অনুপাত (সিআরএআর) ২০২৪ সালের ইতিবাচক ৩.০৮ শতাংশ থেকে ধসে পড়ে ২০২৫ সালে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সিআরএআর হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচক, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক মন্দা বা সংকটের সময়ে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা মূল্যায়নে ব্যবহার করে।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান, এফসিএমএ বলেন, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো আঞ্চলিক প্রতিবেশীরা ধারাবাহিকভাবে মূলধনের বাফার বা ভিত্তি তৈরি করে তাদের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, ‘এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, বাংলাদেশের এই চরম বিচ্যুতি প্রমাণ করে যে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন কঠোর সামষ্টিক সতর্কতামূলক শৃঙ্খলার মাধ্যমে তাদের ব্যাংকিং খাতকে সুরক্ষিত করেছে, আমাদের ব্যবস্থা বারবার করপোরেট ও ঋণ ধাক্কাগুলো শুষে নিয়েছে। এই ঋণাত্মক সিআরএআর স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ এবং ক্রমাগত সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি আমাদের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক মূলধন ভিত্তি গ্রাস করেছে। সাময়িক নীতিগত ছাড় না দিয়ে এখন অবিলম্বে জরুরি কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।’
নন-পারফর্মিং ঋণের হার তীব্রভাবে বেড়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ৩৩.৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে তাদের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২৩.১৯ শতাংশে এবং সম্পদের বিপরীতে গড় আয় (আরওএ) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১.৯০ শতাংশে।
২০২৫ সালে দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এ বছর ব্যাংকগুলো ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৮৫,৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরেই পুনঃতফসিল বেড়েছে ৮৪,৮০০ কোটি টাকা।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৬,৮০০ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ৬৩,৭০০ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে তা ছিল ৯১,২০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট পুঞ্জীভূত পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকায়।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা জানান, ২০২৫ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পুনরায় চালুর পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। আগে ১৮০ দিন বা ৬ মাস ওভারডিউ বা অনাদায়ী থাকলে ঋণ খেলাপি করা হতো, যা ২০২৫ সালের শুরু থেকে কমিয়ে ৯০ দিন বা ৩ মাস করা হয়। এর ফলে খেলাপি ঋণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশের চেষ্টা নেওয়া হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত শিথিলতা আনায় অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ নেয়। পাশাপাশি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগেও পুনঃতফসিল কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সাল থেকে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করতে শুরু করে। ঋণ শ্রেণিকরণের মেয়াদ ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস করায় অনুৎপাদনশীল বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া ২০২৫ সালের শেষের দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া পুনঃতফসিল সুবিধা অনেক প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত রয়েছে শিল্প খাতে (২৯.৫৬ শতাংশ), তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে (১৭.৫৬ শতাংশ) এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা চলতি মূলধন খাতে (১০.১৯ শতাংশ)।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ ও সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা অতিরিক্ত বাড়ার কারণে ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের মুনাফায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) ২০২৪ সালের ইতিবাচক ০.৪৩ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ৪.৮১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইকুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) আগের বছরের ইতিবাচক ৮.৭০ শতাংশ থেকে ভেঙে পড়ে ঋণাত্মক ২৪৩.৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ১৯টি ব্যাংকেরই আরওএ এবং আরওই—উভয় সূচকই ঋণাত্মক ছিল, যা দেশের এক-তৃতীয়াংশ ব্যাংক চরম আর্থিক সংকটে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category