রকমারি ডেস্ক: ভাবুন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে আপনার পোস্ট, ভিডিও, রিল কিংবা ছবি আগের মতোই আছে, মানুষ দেখছেও। কিন্তু সেই কনটেন্ট থেকে আর কোনো টাকা আসছে না। ধরুন, মেটা ঘোষণা দিয়েছে, কনটেন্ট মনিটাইজেশন বন্ধ। আর টাকা নাই। যা করবেন মনের আনন্দে করুন।
প্রথম ধাক্কাটা হয়তো মনে হবে শুধু ইনফ্লুয়েন্সারদের ওপর পড়বে। কিন্তু বাস্তবে এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে আরও অনেক দূর; ক্রিয়েটর, ডিজিটাল মিডিয়া, বিজ্ঞাপনদাতা, ছোট ব্যবসা এবং পুরো অনলাইন কনটেন্ট অর্থনীতিতে। কারণ গত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু যোগাযোগের জায়গা থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে লাখ লাখ মানুষের আয়ের উৎস।
কী ছিল, কী হয়ে গেলো
একসময় ফেসবুকে মানুষ ছবি দিতো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য। এখন সেই ছবির পেছনে থাকতে পারে একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। একজন বিউটি ক্রিয়েটর নিয়মিত মেকআপের ভিডিও করেন। একজন খাবার নিয়ে কনটেন্ট বানান। কেউ ভ্রমণ, কেউ ফ্যাশন, কেউ শিক্ষা, কেউ আবার খবর ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ভিডিও করেন। আপনি দেখছেন, যে যার মতো নাচ, গান, আবৃত্তি করছে, না জেনে লোক হাসাচ্ছে, কিন্তু করছে। কারণ টাকা। লোক হাসলেও, দেখে দেখে টাকার উপার্জনে সাহায্য করছে।
এসব থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয় দর্শক। দর্শক থেকে ফলোয়ার। ফলোয়ার থেকে এনগেজমেন্ট। আর সেখান থেকে আসে বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড সহযোগিতা, স্পনসরশিপ কিংবা প্ল্যাটফর্মের মনিটাইজেশন। অর্থাৎ একটি ভিডিও এখন শুধু ভিডিও নয়। সেটি অনেকের জন্য একটি ডিজিটাল সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো; এর বড় একটি অংশ অন্যের প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল।
কাল যদি টাকা বন্ধ হয়ে যায়?
ধরা যাক, মেটা হঠাৎ ঘোষণা করল আর মনিটাইজেশন নেই। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন সেই ক্রিয়েটররা, যাদের আয়ের প্রধান উৎস প্ল্যাটফর্মের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ। যারা মাসে ২০ হাজার, ৫০ হাজার, ১ লাখ কিংবা তারও বেশি টাকা আয় করছেন, তাদের নিয়মিত আয় এক ধাক্কায় কমে যেতে পারে।আর ছোট ক্রিয়েটরদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। কারণ তাদের অনেকেরই নিজস্ব পণ্য নেই, কোনো সাব্সক্রিপশন মডেল নেই, নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই, এমনকি নিয়মিত ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপ-ও নেই।
তাদের ব্যবসার সমীকরণ এতদিন ছিল; কনটেন্ট থেকে ভিউ, সেখান থেকে রিচ আর যত রিচ তত আয়। মেটা যদি মাঝখানের অর্থপ্রবাহটি বন্ধ করে দেয়, পুরো সমীকরণটাই ভেঙে যাবে। তখন আপনার প্রিয় ফলোয়ার কি সম্পদ থাকবে? এখানেই আসল প্রশ্ন। একজন ক্রিয়েটরের ১০ লাখ ফলোয়ার থাকতে পারে। কিন্তু সেই ১০ লাখ মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা না থাকলে ফলোয়ার সংখ্যা যত বড়ই হোক, সেটি পুরোপুরি তার নিজের সম্পদ নয়।
কারণ ফেসবুক তার অ্যলগারিদম বদলাতে পারে। রিচ কমে যেতে পারে। মনিটাইজেশন নীতি বদলাতে পারে। কোনো কনটেন্ট ক্যাটাগরির ডিস্ট্রিবিউশন কমে যেতে পারে। এমনকি কোনো পেজে বার ও দিতে পারে। অর্থাৎ অডিয়েন্স আছে, কিন্তু তার ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ নেই। ডিজিটাল দুনিয়ায় এটিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
এতে কি ক্রিয়েটিভিটি বাড়বে
মেটা যদি তার মনিটাইজেশন বন্ধ করে, তখন সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে ক্রিয়েটরদের ব্যবসায়িক চিন্তায়। একজন বিউটি ইনফ্লুয়েন্সার ভিডিও করে করে টাকা আয়ের বদলে হয়তো নিজের কসমেটিক ব্র্যান্ড চালু করবেন। ফুড ক্রিয়েটর খুলবেন রেস্টুরেন্ট, ফিটনেস ক্রিয়েটর শুরু করতে পারেন পেইড ফিটনেস প্রোগ্রাম। ফলে এই অডিয়ন্সকে কাজে লাগিয়ে আয়ের উৎস বের করতে গিয়ে নিজের মতো করে কিছু করতে পারার প্রবণতা বাড়বে।
ফলে সর্বোচ্চ খারাপটা ভেবে নিয়েই নিজের অডিয়েন্স তৈরি করার সময় এখনই। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ডিজিটাল মিডিয়াকে নিজেদের ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হবে। ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ-এর পাশাপাশি আরও রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে। বিভিন্ন আয়ের পথ তৈরি করতে হবে। প্ল্যাটফর্ম আপনার অডিয়েন্স এনে দিতে পারে, কিন্তু সেই অডিয়েন্সের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত আপনার নিজের হওয়া দরকার।