প্রভাত রিপোর্ট: নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো—সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় কতটা বাড়বে? দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁদের বড় একটি অংশের বেতন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ছে না। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় অপরিবর্তিত থাকলে দুই খাতের আয়বৈষম্য আরও দৃশ্যমান হতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের বিষয়টি। দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী কিংবা সীমিত আয়ের মানুষ সরাসরি নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন না। কিন্তু বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে তাঁদের ওপরও সেই চাপ পড়বে।
ফলে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা যাতে শুধু একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য সামগ্রিক অর্থনীতিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু উৎপাদন কমে গেলে বা সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে বাড়তি চাহিদা সরাসরি পণ্যের দামে চাপ তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয় ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা নিয়ে বেসরকারি খাতে নানা চাপ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না করে শুধু মানুষের হাতে অর্থ বাড়ালে চাহিদা বাড়বে, কিন্তু সরবরাহ সেই হারে বাড়বে না— এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সরকারি বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
তাদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণে। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে বা তার ওপরে থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ হবে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এর বড় উদাহরণ। ফলে এসব কর্মচারীর হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসবে এবং তারা খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে বেশি ব্যয় করতে পারবেন।
এটি একদিকে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াবে, অপরদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও ইতিবাচক হতে পারে। মানুষের হাতে টাকা বাড়লে দোকান, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, পোশাক, গৃহস্থালি পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে বিক্রি বাড়তে পারে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা গতি পেতে পারে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হতে পারে তখনই, যখন বাড়তি চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়বে না।
প্রায় একযুগ পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। গ্রেড-ভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ও পেনশনও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামোর সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন পর সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরতে পারে। মূল্যস্ফীতির কারণে যাদের প্রকৃত আয় কমে গেছে, বেতন বৃদ্ধির ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা পুনরুদ্ধার হবে। কিন্তু এর বিপরীত দিকও রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের আয় একসঙ্গে বড় হারে বাড়লে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে যদি পণ্য ও সেবার সরবরাহ তাল মিলিয়ে বাড়ানো না যায়, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি বেতন বৃদ্ধি নিজে থেকেই মূল্যস্ফীতি বাড়াবে— এমন সরল সমীকরণ নেই। তবে অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির একটি কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম হলো, কোনও পণ্যের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ একই থাকলে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। সরকারি চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবায় এর প্রভাব পড়তে পারে। এমনিতেই এসব খাতে মানুষের ব্যয় বাড়ছে। নতুন বেতন কাঠামোর ফলে বাড়তি অর্থের একটি অংশ এসব খাতে ব্যয় হলে বাজারে চাহিদা আরও বাড়বে। তবে এই প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে বেতন বৃদ্ধির বাস্তবায়নের গতি, মানুষের ব্যয়ের ধরন, উৎপাদন পরিস্থিতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর। সরকার যদি তিন ধাপে বেতন বাড়ায়, তাহলে একবারে বাজারে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহের চাপ কম থাকবে। এ কারণেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটি মূল্যস্ফীতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
নতুন বেতন কাঠামোর আরেকটি বড় বিষয় হলো সরকারের নিজস্ব ব্যয়। প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীসহ প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন কাঠামোর সুবিধা পাবেন। এর ফলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই বাড়তি অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকারের রাজস্ব আদায় যদি কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ে, তাহলে বেতন-ভাতার অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারের অন্য খাতের ব্যয় কমাতে হতে পারে অথবা ঋণ নিতে হতে পারে। আবার অতিরিক্ত অর্থ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হলে তারও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায় দুর্বল থাকা অবস্থায় সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়লে আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো বেশ দুর্বল।’’ তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি যৌক্তিক মনে করেন।
তবে তাঁর মতে, এই মুহূর্তে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত না নিয়ে আরও এক থেকে দুই বছর পর এটি করা হলে ভালো হতো। কারণ বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেশ উচ্চ। সরকার যেহেতু ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে চায়, এতে মূল্যস্ফীতির ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ কিছুটা কমবে। মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘‘এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নেই বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ সরকারের রাজস্ব আদায় অত্যন্ত দুর্বল এবং অর্থনীতির অবস্থাও খুব ভালো নয়। সরকারের যে পরিমাণ রাজস্ব আসছে, তা দিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।’’ তাঁর মতে, এসব খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় না করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন বেতন কাঠামোয় অবসরপ্রাপ্তদের জন্যও বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনামূলক বেশি হারে পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন হলে তা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। ধাপে ধাপে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া এবং কম পেনশন পাওয়া মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আসতে পারে। তবে এর অর্থ হলো সরকারের নিয়মিত ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে শুধু বর্তমান কর্মচারীদের বেতন নয়, অবসরপ্রাপ্তদের বাড়তি পেনশনের অর্থের সংস্থানও সরকারকে করতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন হয়নি। অথচ এই সময়ে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এ অবস্থায় তাঁদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।’’ তবে বেতন বাড়ানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো— এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকার যদি কর ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিবর্তে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নেয়, অর্থের জোগান বাড়িয়ে দেয়, কিংবা প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দেয়— তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার ফলে বাজারে যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহনসহ প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার সরবরাহও বাড়াতে হবে। অন্যথায় বাড়তি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এতে সরকারি কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির সুফল নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিন পর বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে তাঁদের জন্য স্বস্তির খবর। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার পর নতুন বেতন কাঠামো তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী ও কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন। তবে বৃহত্তর অর্থনীতির জন্য এই সিদ্ধান্তের ফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের পদ্ধতির ওপর। ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানো হলে একসঙ্গে অর্থপ্রবাহের চাপ কম থাকবে। পাশাপাশি সরকার যদি রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে এবং উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অপরদিকে রাজস্ব আদায় দুর্বল থাকা, সরকারি ব্যয় বাড়া এবং বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ অপর্যাপ্ত থাকলে নতুন বেতন কাঠামো মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের আসল পরীক্ষা শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন কত বাড়ল, তা নয়— এই বাড়তি আয় কীভাবে অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে এবং তার বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ কতটা বাড়ানো যাবে—সেটিই নির্ধারণ করবে এটি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হবে, নাকি মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি করবে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, নবম জাতীয় বেতনস্কেল প্রায় ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সুখবর হলেও দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অশুভ সংবাদ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এর ফলে শ্রমবাজারে বিদ্যমান বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, এমনিতেই ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। নতুন কর্মসংস্থানও প্রত্যাশিত হারে তৈরি হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে প্রায় ২০ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জন্য বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত শ্রমবাজারের ভারসাম্য আরও নষ্ট করতে পারে। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপরও নেতিবাচকভাবে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নাজের হোসাইন বলেন, অতীতের সরকারগুলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একাধিকবার বেতনস্কেল ঘোষণা এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা ও সেবার মান প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ বা ‘উপরি’ ছাড়া সরকারি দফতরে কাজ করানো কঠিন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তাই শুধু বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালেই সরকারি সেবার মান উন্নত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকার নিজেই বলছে, তারা আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ঘাটতি ও নানা সমস্যার চাপ সামলাচ্ছে। একই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি—কোনো খাতেই পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শ্রমবাজারে বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে অর্থনীতির ওপর।
ক্যাবের এই নেতা বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিপুলসংখ্যক চাকরিচ্যুত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। এর পরিবর্তে সরকারি বেতন-ভাতা বাড়াতে দ্রুত বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল নাও আনতে পারে। বরং সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়ে বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে যদি তাদের কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে মনে করেন নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, বেতন বৃদ্ধির পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি আরও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, সরকারি দফতরের কাজের গতি বাড়ে এবং জনগণ দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পান, তাহলে এই বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি যদি কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সেবার মান নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অবশ্যই এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো উচিত।