প্রভাত রিপোর্ট: প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। এই নির্বাচনে রক্তপাত বন্ধ করাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য। বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসের (আনফ্রেল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর্যবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব এসব কথা বলেন।
সিইসি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাতের ঘটনা বেশি হয়েছে। অনেক জায়গায় শুধু প্রাণহানি নয়, বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হয়েছে। এ জিনিস থামাতে হবে। তা থামানোটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমরা কোনো রক্তপাত চায় না। রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা দিতে চাই। এজন্য আমরা সকলের সহযোগিতা চাই।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে। আমরাও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করবো। এছাড়া সবাইকে একত্রিত করার চেষ্টা করব। যাতে করে এ ধরনের সংঘাত এড়িয়ে সুন্দর স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিতে পারি, সে চেষ্টা করব।
সিইসি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সুশাসনের জন্য নাগরিক -সুজনের তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত হন। এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১১৬ জন নিহত হন। তিনি বলেন, আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি থাকবে না। গণতন্ত্র শুধু জাতীয় পর্যায়ে হলে হয় না, তৃণমূলের গণতন্ত্র আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউপি সদস্যরা সরাসরি মানুষের সেবার সঙ্গে জড়িত। গণতান্ত্রিক সরকারের সেবাগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছায়। তাই স্থানীয় সরকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দলীয় সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসি চাপ বোধ করবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, নির্বাচনের জন্য সরকার মূল অংশীজন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব হয় না। কারণ, সরকারের সব এজেন্সিকে আমরা কাজে লাগাই। পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসনসহ সব সরকারের লোক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা চেয়েছি, তা তারা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের সফলতার জন্য তাদের অবদান অবশ্যই আছে। গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে সে উদাহরণ আমরা সৃষ্টি করতে পারব। কারণ, রাজনীতিবিদেরা দেশের কথা চিন্তা করেন, মঙ্গলের জন্য কথা চিন্তা করেন। তাই সবাই মিলে আমরা ভালো নির্বাচন দিতে পারব।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, এ সরকারের অধীনে তো আমরা কোনো নির্বাচন করিনি। তাই এ নিয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করা যায় না। আমাদের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৬১ জেলা পরিষদ, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং প্রায় ৩৩০টি পৌরসভা রয়েছে। এসব পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজন একটি বিশাল দায়িত্ব। এখানে সহযোগিতা আরও বেশি প্রয়োজন।
জাতীয় নির্বাচনে ঋণখেলাপিদের অংশগ্রহণের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, এ নিয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে চাই না। কারণ, সর্বোচ্চ আদালতে ২টি মামলা (চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসন) বিচারাধীন আছে। তবে আমরা কারও প্রতি দয়া দেখাইনি। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনে কোথায় কোথায় আমাদের উন্নতি করতে হবে তা চিহ্নিত করছি। কারণ নির্বাচন কমিশন দু’টো জাতীয় নির্বাচন করতে পারে না। তারা একটা নির্বাচন করে বিদায় হয়ে যায়। নতুন কমিশন এসে নতুন করে শুরু করে। তাই তাদের জন্য নির্বাচনের অভিজ্ঞতা রেখে দিতে চাই। আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল, তাদের কোথায় উন্নতি করতে হবে? এগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।
সিইসি আরো বলেন, আমরা অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলব। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের সমর্থন খুবই দরকার। তাদের সমর্থন ছাড়া সংঘাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব না। কারণ ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাত হয়েই থাকে। জাতীয় নির্বাচন যেহেতু সংঘাতমুক্ত করা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা পারব, সে আত্মবিশ্বাস আছে। কমিশন সে চেষ্টা করবে। ইসি কারও পক্ষেও না, কারও বিপক্ষেও না। আমরা সবার জন্য সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই। তিনি বলেন, এদেশের কীসে মঙ্গল, কীসে ভালো তা নিয়ে সর্বক্ষণ আমাকে ভাবায়। আমি সিইসি না হলেও বাসায় বসে তা চিন্তা করতাম। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছি। যে কোনো পরিস্থিতিতে দেশের মঙ্গল চিন্তা করি আমি। নির্বাচন প্রক্রিয়াটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, আমি চাচ্ছিলাম নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতাটা যাক। জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতাটা যাক। তাদের পরিস্থিতি সামলাতে দিন। কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বছরের পর বছর চলবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক সরকার আসতেই হবে, যার মাধ্যমে সবকিছু করা সম্ভব হয়। দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। এ সময় ইসি সচিব আখতার আহমেদ ও আয়োজন সংগঠনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।