• মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০০ অপরাহ্ন
Headline
অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: অ্যাটর্নি জেনারেল পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহযোগিতা করবে বিএনপি : খায়রুল কবির ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া হবে: জাহেদ উর রহমান পরাজিত শক্তির কালো টাকা দিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চক্রান্ত চলছে : রিজভী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিন্দুমাত্র কলঙ্ক নিতে চায় না সরকার : প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম জার্মান পর্যটক ফিরে পেলেন তাঁর চুরি হওয়া ল্যাপটপটি এসএসসিতে দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের ১৫ দিনের মধ্যে আবার পরীক্ষা : শিক্ষামন্ত্রী গোডাউনে কোটি টাকার মালামাল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষীবাজারে শরণখোলায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ ও র‍্যালি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বাড়তি বরাদ্দ ইতিবাচক বার্তা

Reporter Name / ৯৫ Time View
Update : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় স্বাস্থ্যখাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়তে পারে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত বিভাগগুলোর তালিকায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে দ্বিতীয় অবস্থানে রাখা হচ্ছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও প্রশ্ন উঠছে- এই বাড়তি বরাদ্দ কি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বদলাতে পারবে?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বৃদ্ধি স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়। বরং, দেখতে হবে, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপি এবং মোট বাজেটের কত শতাংশ। কারণ, অতীতে বহুবার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়লেও জিডিপির অনুপাতে সেই বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য ছিল না।
তারা বলছেন, স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা না পাওয়ায় উপজেলা, জেলা কিংবা রাজধানীর বড় হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। তাই, এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত যেন অধিকাংশ মা ও শিশু উপজেলা পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় শহরমুখী হতে না হয়। তারা আরও বলছেন, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন মানে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ বা শয্যা বৃদ্ধি নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ রোগাক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সেবা পাবে, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এবং হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে। একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো আগে থেকেই সেই রোগের প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা।
স্বাস্থ্যখাতে বাড়তি বরাদ্দ অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এমনটি উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বরাদ্দ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্র বদলাতে পারবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করবে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার এবং বাস্তবায়ন কৌশলের ওপর। তাই এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি বাড়তি অর্থের বড় অংশ কেবল পরিচালন ব্যয় বা অবকাঠামো সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যসেবার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট দিতে পারে সরকার। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের ওপর বিশেষ গরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
এ লক্ষ্য সামনে রেখেই আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। এতে আগামী বছরের বাজেটে যে ১০টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগে সব থেকে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, সেই তালিকায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসছে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়ার তালিকায় সাত নম্বরে ছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৩১ হাজার ২২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ, আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ বাড়ছে ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। আর মোট বাজেটের আকারের হিসাবে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে দশমিক ৬৭ শতাংশ।
এদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। এ হিসাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে জিডিপির দশমিক ৬৩ শতাংশের সমান বরাদ্দ থাকছে। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির যে প্রক্ষেপণ করা হয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে তার দশমিক ৫০ শতাংশের সমান বরাদ্দ রাখা হয়। এ হিসাবে জিডিপির ভিত্তিতেও আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বাড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক বিশেষ স্বাস্থ্য সহকারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য খাতকে জাতীয় বাজেটের অগ্রাধিকারের তালিকায় আরও ওপরে নিয়ে আসার দাবি জানিয়ে আসছে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই স্বাস্থ্যখাত বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রথম তিনটি খাতের মধ্যে থাকে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তিনি বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ শনাক্তকরণ (স্ক্রিনিং) ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ দীর্ঘমেয়াদি বা অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করা, যেসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করে। মানুষ মূলত দুটি কারণে স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপে দরিদ্র হয়ে পড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর একটি হলো দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে, অন্যটি ব্যয়বহুল রোগ নির্ণয় (ডায়াগনস্টিক) পরীক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে। তাই বাজেটের অতিরিক্ত বরাদ্দ এমন খাতে ব্যয় করা উচিত, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাবে এবং প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করবে। এই বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এবং মানুষের দারিদ্র্যের কারণ হয়ে দাঁড়ানো রোগগুলোর চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে স্বাস্থ্যখাতে এই অতিরিক্ত বরাদ্দ দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনবে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বাড়লেই সেটিকে বড় পরিবর্তন বলা যায় না। কারণ মোট বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই দেখতে হবে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির কত শতাংশ এবং মোট বাজেটের কত শতাংশ। যদি এই অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ে, তাহলে এটিকে রুটিন বাজেট বৃদ্ধি ছাড়া অন্য কিছু বলা যাবে না। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। আগামী বাজেটে এটি অন্তত ২ শতাংশ বা তার বেশি হওয়া উচিত। একইভাবে মোট বাজেটেরও অন্তত ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তিন্ িআরও বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা তুলে ধরলেও বাস্তবে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ অনেক সময় কমেছে। ফলে প্রকৃত অগ্রগতি বোঝার জন্য শতাংশের হিসাবই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, শুধু হাসপাতালের শয্যা (বেড) বাড়ানো কোনো কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি হতে পারে না। বরং, মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনই যেন কমে আসে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন মানে শুধু আরও হাসপাতাল বা আরও শয্যা নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হবে, যখন মানুষ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাবে, রোগ প্রতিরোধ হবে এবং হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে। ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, বাড়তি অর্থের বড় অংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ব্যয় করা প্রয়োজন। নতুন প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, শহর ও গ্রামে সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। এজন্য কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে হবে। মা ও শিশুস্বাস্থ্যের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, সরকারের নীতিগত অঙ্গীকার অনুযায়ী এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যেন মা ও শিশুর অধিকাংশ চিকিৎসাসেবা উপজেলা পর্যায়েই পাওয়া যায় এবং তাদের জেলা বা রাজধানীমুখী হতে না হয়। তিনি আরও বলেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত ধাপে ধাপে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা। সরকারের বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ বাজেটে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category