• বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ১০:০৫ অপরাহ্ন
Headline
জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলে সাবেক সচিব জিয়াউল আলমকে এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশে বিশৃঙ্খলার অপচেষ্টা চলছে এস কে সুরের দুর্নীতির মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ২৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান বিচারপতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করায় সহকারী রেজিস্ট্রার বরখাস্ত গৃহায়ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি হলে ব্যবস্থা: ত্রাণমন্ত্রী ‘শিক্ষিত তরুণরা খামার ব্যবস্থাপনায় এলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মজবুত হবে’ বেসরকারি হাসপাতালেও কম খরচে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে: সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দক্ষতার ঘাটতিতে দেশে উচ্চশিক্ষিত ৯ লাখ যুবক বেকার আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে ভারত-ভিয়েতনাম, চাপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে ভারত-ভিয়েতনাম, চাপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

Reporter Name / ৮ Time View
Update : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: তৈরি পোশাকের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ চীন তার বৈশ্বিক বাজার ধরে রাখতে মূল্যছাড়ের কৌশল নিয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তান উচ্চমূল্যে পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি মোট রপ্তানিও বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
সেখানে বাংলাদেশ রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে সামান্য প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে আগের অবস্থান কোনোমতে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য বিশ্লেষণে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক তৈরি পোশাকের বাজার ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ সম্প্রসারিত হলেও সেই বাড়তি বাজারের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে বৈশ্বিক তৈরি পোশাকের বাজার ছিল ৫৪৫ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। সে সময় বিশ্বের পোশাক রপ্তানির ৩১ দশমিক ৭১ শতাংশ ছিল চীনের দখলে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব ছিল ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের ছিল ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এছাড়া ভারতের অংশ ছিল ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
পাঁচ বছর পর ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক বাজারের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে। তবে এই সময়ে চীনের বাজার অংশীদারিত্ব কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের অংশও কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে। বিপরীতে ভিয়েতনামের বাজার অংশীদারিত্ব বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশে পৌঁছেছে এবং দেশটি বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। ভারতের অংশ বেড়ে ৩ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১ দশমিক ৭৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
২০২৫ সালে বৈশ্বিক পোশাক বাজারের মূল্য ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বাড়লেও চীনের পোশাক রপ্তানি মূল্য আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজার ধরে রাখতে দেশটি মূল্যছাড়ের নীতি অনুসরণ করেছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের মূল্য বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ মূল্য বেড়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে বৈশ্বিক বাজারে ২১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা চীনের ২২ দশমিক ১৯ শতাংশের চেয়েও বেশি ছিল। একই সময়ে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ভারতের ২৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৯ দশমিক ১১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে শুধু কম দামে বেশি পণ্য রপ্তানির প্রতিযোগিতা নয়; বরং উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজনভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ বাস্তবতায় পণ্যে বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, নকশা উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে দ্রুত অগ্রসর হতে না পারলে বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শেয়ার কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের সার্বিক পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ হলেও বাংলাদেশের বাজার হারানোর হার অন্য প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। পরবর্তী মাসগুলোর চিত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দাভাবের পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নীতিগত ও কৌশলগত দুর্বলতাই বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কোনো অগ্রগতিও হয়নি। আমরা মূলত আগের অবস্থানেই স্থির রয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন দেশের যে মার্কেট শেয়ার (বাজার অংশীদারত্ব) বেড়েছে, তার একটি বড় অংশ এসেছে চীন থেকে সরে যাওয়া ব্যবসা থেকে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং শুল্কের প্রভাবে মার্কিন ক্রেতারা এখন ব্যাপকভাবে চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে নতুন উৎস খোঁজার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা। চীনের এ বাজার হারানোর সরাসরি সুফল পাচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু চীন থেকে স্থানান্তরিত হওয়া এই বিপুল বাণিজ্যের সুবিধা অন্য দেশগুলো যেভাবে লুফে নিতে পেরেছে, বাংলাদেশ তা পারেনি। এর প্রধান কারণ হিসেবে মহিউদ্দিন রুবেল প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিকেই দায়ী করেন। একটি দেশের বাজার ধরতে বা বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য যে ধরনের কার্যকর বিপণন, উন্নত অবকাঠামো, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়, আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো তা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আর এ কারণেই আমরা প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি।
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান ধরে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে উঠতে দ্রুত নীতিগত ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। তিনি বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরে আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার চরম অভাব ছিল। প্রথমত, পোশাক খাতে প্রণোদনা কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, গত এক বছরে দেশের ব্যাংকগুলো চরম দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্যাংক নিজেই যেখানে দুর্বল, সেখানে তারা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিতে পারছে না।’ তবে ব্যাংক খাতের এই সংকটের পেছনে ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ না করা কিছু গার্মেন্টস মালিকেরও দায় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত এক বছর ধরে জ্বালানি তেলের সরবরাহ অনিশ্চিত ও অনিয়মিত ছিল। তার ওপর বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়েছি।’
এই সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে বেশ কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন এই ব্যবসায়ী নেতা। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের আগ্রাসী বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। বাংলাদেশ এখনো হাতেগোনা কয়েকটি প্রচলিত পোশাক তৈরি ও রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
কৃত্রিম তন্তু বা ‘ম্যান-মেড ফাইবার’ভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই খাতে আমাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, কাজগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে একবার যে অংশ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তা সহজে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category