• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১০:৪৮ অপরাহ্ন

মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

প্রভাত সংবাদদাতা,বরিশাল : ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জানাজা ভোলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার বাদ জোহর ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী-সমর্থক এবং বহু মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এর পর কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তোফায়েল আহমেদের শ্যালক আলমগীর তালুকদার বলেন, মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ ভোলায় নিয়ে আসা হয়। জোহরের নামাজ শেষে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তার জন্মভূমি ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তার বাড়িতে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তোফায়েল আহমেদকে তার বাবা-মার পাশেই শায়িত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জানাজায় সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
এদিকে, জানাজায় অংশ নিতে বেলা ১২টার পর থেকে লোকজন স্কুলমাঠে আসতে শুরু করেন। এ সময় মাঠের বিভিন্ন স্থানে বসে সবাই তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সফলতার কথাগুলো আলোচনা করছিলেন। বিশেষ করে, ভোলার প্রতি তোফায়েল আহমেদের যে ভালোবাসা তা তারা অকপটে স্বীকার করে এখানকার উন্নয়নে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোলা সদরের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ শাসনামলে যারাই ভোলার এমপি হয়েছেন সবাইকে তোফায়েল আহমেদের একটি বার্তা ছিল, এলাকার উন্নয়ন করতে হবে। আর তার কথার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ভোলার এমপিরাও এলাকার উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। তোফায়েল আহমেদ মৃত্যুর আগেই তার গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার পাশেই কবর দেয়ার জন্য বলে যান। যা আজ বাস্তবায়ন করা হলো।’
ভোলা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ রুবেল বলেন, ‘বিএনপি সহানুভূতিশীল এবং মানবিক দল। এ কারণে তোফায়েল আহমেদের জানাজা যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সে ব্যবস্থা করেছে জেলা ছাত্রদল। আওয়ামী লীগ আমলে তাদের মধ্যে সেই মানবিকতা মোটেই ছিল না। তারা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নুর আলমের জানাজা পড়তে দেয়নি।’


মায়ের চিরসান্নিধ্যে ফিরলেন ক্ষণজন্মা, কীর্তিমান

ফাতেমা খানমের খুব আদরের সন্তান ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। জীবনের ব্যস্ততা, রাজনীতির উত্তাল দিন, আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়—সবকিছুর মাঝেও মা ছিলেন পরম নির্ভরতার স্থল, প্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের রূপকারদের অন্যতম তোফায়েল আহমেদ মাকে নিয়ে ২০১৮ সালে এক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, “মা এবং মাতৃভূমি আমাদের কাছে সমার্থক। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিববাহিনীর প্রশিক্ষণরত সদস্যদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, আমরা জানি না। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশকে হানাদারমুক্ত করতে না পারবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’ সেদিনের সেই শপথও আমরা জীবনবাজি রেখে বাস্তবায়ন করে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করেছি। যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে আমি ও রাজ্জাক (প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক) ভাই ১৮ ডিসেম্বর এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ ২২ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করি। আর ২৮ ডিসেম্বর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে অবস্থানরত আমার পরম শ্রদ্ধেয় জননীর কোলে ফিরে যাই। দ্বীপ জেলা ভোলার সন্তান তোফায়েল আহমেদ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে পৌঁছেও মাতৃস্নেহের কাঙাল থেকেছেন। জেলগেট থেকে শুরু করে মন্ত্রীপাড়া কোথায় নেই মা।
তোফায়েল আহমেদ স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বমোট সাত বার আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি জায়গায় আমার বৃদ্ধা মা ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছেন। সে কী কষ্ট! জেলগেটে যখন মা আমার সঙ্গে দেখা করতেন, সর্বক্ষণ আমার মাথাটা মায়ের বুকে থাকতো। তারপর যখন তিনি আমাকে রেখে বিদায় নিতেন, তখন তাঁর দুই চোখে অশ্রুর নদী। দুই ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, এক ছেলে কারান্তরালে। কী নিঃস্ব-রিক্ত আমার মা!’ দেশের মন্ত্রী হওয়ার পরেও মায়ের কাছে তোফায়েল আহমেদ ছিলেই আদরের সেই ছোট্ট ‘মনু’।
তিনি লিখেছেন, “সুখে-দুঃখে মা আমায় ছায়া দিতেন বটবৃক্ষের মতো। ’৯৬-এ সরকার গঠনের পর আমি তখন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। বেইলি রোডে অবস্থিত বাসভবন ‘তন্ময়’-এ থাকি। মা আমার সঙ্গেই থাকতেন। প্রতিদিন মায়ের আদর নিয়ে তবেই দিনের কাজ শুরু করতাম। বনানীর যে বাসায় এখন থাকি, এই বাসায় আমার শয়নকক্ষের পাশেই মায়ের ঘর। সকালে ঘুম ভাঙার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন, আদর ছিল নিত্য দিনের পাথেয়। মাকে চুমু দিয়ে সকালে বের হতাম। আমি না ফেরা পর্যন্ত মা জানালার কাছে হাতে তসবিহ নিয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন কখন ফিরি। ঘরে প্রবেশ করেই মাকে চুমু দিয়ে রুমে যেতাম।” মমতাময়ী মাকে হারানোর বেদনা আমৃত্যু বহন করেছেন তোফায়েল আহমেদ। ফাতেমা খানমের কবর-ফলকে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি উৎকীর্ণ করে লিখেছিলেন –
‘মা, বাবা চলে গেছেন অনেক আগে
চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তোমারই পাশে
তুমিও চলে গেলে আমাদের
সকলকে কাঁদিয়ে,
তবুও তোমরা আছো সর্বক্ষণ
আমাদের হৃদয় জুড়ে।
মা, প্রতি মুহূর্ত তোমাদের অভাব
অনুভব করি।
তোমার মনু (তোফায়েল)’
৮২ বছরের জীবন শেষে আবার মায়ের সান্নিধ্যে ফিরলেন জাতির সূর্যসন্তান। এ যেন দ্বিতীয়বার এবং চিরস্থায়ী ফিরে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর মাথা উঁচিয়ে জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর। এর ছয়দিন পর ২৮ ডিসেম্বর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে ফেরেন জননীর বুকে।
এবার ৫৪ বছর ৫ মাস ৫ দিন পর ফাতেমা বেগমের কাছে চিরদিনের জন্য ফিরে গেলেন তার আদরের ‘মনু’। অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরশায়িত হলেন বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের অন্যতম রূপকার তোফায়েল আহমেদ। জীবন সমাপ্তিতে যেন পূর্ণতা পেল হারিয়ে যাওয়া মায়ের কাছে সন্তানের ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। যে মানুষটি সারাজীবন ভালোবেসেছেন দেশ মাতৃকাকে, ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেছেন, তিনি শেষ আশ্রয়ও নিলেন শেকড়ের কাছেই মায়ের পাশে। তোফায়েল আহমেদের মরদেহ মঙ্গলবার ভোলায় নেয়ার পর হাজার হাজার মানুষ চোখের পানিতে জানায় শেষ বিদায়। দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’। এরপর বেলা সোয়া ৪টার দিকে ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে চির শায়িত হন ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির এই উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন সময়কে বদলে দিতে। তাঁদের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও কীর্তি হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই এক ক্ষণাজন্মা, কীর্তিমান মানুষ। তাঁর প্রস্থান একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক অমোচনীয় নাম।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category