প্রভাত অর্থনীতি: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বরাদ্দ আছে মোট ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। নতুন বেতন কমিশন সুপারিশ করেছিল, আগামী অর্থবছরের জন্য বাড়তি লাগবে এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের সুপারিশ আগামী অর্থবছরে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা দিতেই ব্যয় হবে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।
অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে সরকার। এ কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ সংবলিত কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেয়।
ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার দুই মাস পর নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি তিন ধাপে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করে। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, সরকার শেষ পর্যন্ত এ সুপারিশই আমলে নিচ্ছে।
বেতন কমিশনের প্রতিবেদন তৈরির আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য, পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি, প্রতিবেশী দেশের বেতন-ভাতা, বেসরকারি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা, মানুষের জীবনমানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা সুপারিশ করা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। বাকি ৫০ শতাংশ পাবেন পরের অর্থবছরে। তার পরের অর্থবছরে পাবেন তাঁরা ভাতা, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বেতন-ভাতা সবই পাবেন সরকারি কর্মচারীরা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে কথা বলবেন। কেন আংশিক সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সে ব্যাখ্যাও দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী।
গত ১৭ মে গণমাধ্যমকে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমাদের বাজেটের সীমাবদ্ধতা আছে। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। অর্থনীতির অবস্থা খারাপ, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহের অবস্থা খারাপ। ফলে অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে ও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তার মধ্যেও নতুন বেতনকাঠামোর দিকটা দেখতে হচ্ছে।’
অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্প্রতি এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আগামী অর্থবছর অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতনকাঠামোর বাস্তবায়ন হবে। কীভাবে তা উত্তম উপায়ে করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে।’
প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়ার পর গত ২১ মে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের জন্য আবার বৈঠক করে নাসিমুল গণির কমিটি। সূত্রগুলো জানায়, এ বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় যে আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন পাবেন।
গত মাসের মাঝামাঝি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী যখন বাজেটের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন, তখন সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় ছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি যে তিন ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে, প্রধানমন্ত্রী তাতেই সম্মতি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত বেতনকাঠামোতে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। তবে গ্রেড (ধাপ) রাখার কথা বলা হয়েছে আগের মতোই ২০টি। কমিশন বর্তমানের সর্বনিম্ন বেতনকাঠামো ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। আর সর্বোচ্চ বেতনকাঠামো নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয়েছে নির্ধারিত এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য ২০ ধাপের বাইরে একটি ধাপ তৈরি করবে অর্থ বিভাগ, যা পরে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।
কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও শতভাগের বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান, এমন পেনশনভোগীদের পেনশন ১০০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি হতে পারে। তবে যাঁরা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পান, তাঁদের পেনশন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। আর যাঁরা মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাঁদের পেনশন বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত।
এদিকে ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের চিকিৎসার ভাতা ১০ হাজার টাকা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ৫৫ থেকে ৭৪ বয়সী পেনশনভোগীরা পেতে পারেন ৮ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা। ৫৫ বছরের কম বয়সীদের চিকিৎসার ভাতা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে ৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া বেশি বেতনের সরকারি চাকরিজীবী, অর্থাৎ প্রথম থেকে দশম ধাপ পর্যন্ত চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক কম হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ের যে পরিস্থিতি, তাতে এক অর্থবছরে সুপারিশ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। সরকার যেভাবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে, সেটাই ঠিক আছে।
আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে কি পরের অর্থবছর থেকে বেতন-ভাতা সব দেয়া ঠিক হবে বলে মনে করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মাহবুব আহমেদ বলেন, ‘সেটা আমি বলতাম, তবে পারছি না। এত রাজস্ব আদায়ের বাস্তবতাও কম। অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকার মনোযোগ দিয়েছে, যার দরকারও আছে। এ খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় হবে বলে আমরা অনুমান করছি। ফলে ধাপে ধাপে বেতন-ভাতা দেওয়াটাই হবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।’
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, যিনি গত অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টাও ছিলেন, তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি যে দরকার, এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সুপারিশ অনুযায়ী আগামী অর্থবছর থেকে পুরোটা বাস্তবায়ন করা গেলে ভালো হতো। কিন্তু সরকারের আয়ের যে অবস্থা, এবার অন্তত তা সম্ভব হবে না। আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘পেনশনধারী হিসেবে আমি ৩৪ হাজার টাকা পাই মাসে। এ টাকা আমার ওষুধ কেনার পেছনেই ব্যয় হয়ে যায়। ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে সরকার যেন নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারে, এটা আমরা আশা করব।’