• রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫০ অপরাহ্ন
Headline
ইন্দোনেশিয়ায় নিখোঁজ জাহাজের ১০২ যাত্রী উদ্ধার সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি হুতিদের, বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আর ১৪ দিন চলার মতো তেল অবশিষ্ট আছে! হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা, শঙ্কা বাড়ছে তেল সরবরাহে দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিন কাশ্মীরি নেতার বৈঠক হুথিদের বিরুদ্ধে স্থল যুদ্ধের জন্য পুনর্গঠিত হচ্ছে ইয়েমেনের সেনারা গ্রিডে যুক্ত হলো আদানির ইউনিট-২, বাড়বে বিদ্যুৎ সরবরাহ ইসলামী ব্যাংকের সামনে চাকরি ফেরত চেয়ে অবস্থান, গ্রাহকদের পাল্টা কর্মসূচি ৯৬৮ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ইস্যু করতে চায় জিপিএইচ ইস্পাত নতুন করে চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি

হুতিদের নিয়ন্ত্রণে বাব আল–মানদেব, হুমকির মুখে বিশ্ববাণিজ্য

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রভাত ডেস্ক: লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে সরু জলপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনে বিকল্প জলপথ হিসেবে এর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। কিন্তু সেই পথও এখন হুতিদের নিয়ন্ত্রণে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খুলতে তারা এই তৎপরতা চালিয়েছে। এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে সপ্তম মাসে গড়িয়েছে। খবর সিএনএনের
এএফপির সংবাদে বলা হয়েছে, শুক্রবার বাব আল–মানদেব প্রণালির পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতিরা। তারা বন্দরনগর মোখা দখল করেছে। ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তাদের দাবি, নৌপথটির মাঝখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপও হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। বাব আল-মানদেব দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে নিকটবর্তী হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছিল।
এর মধ্যে শনিবার সকালে আল–জাজিরার সংবাদে বলা হয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এদিকে ইরাক থেকে চালানো ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর সৌদি আরব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। আরও হামলা ঠেকাতে ইরাকি কর্তৃপক্ষকে সময় দিতে তারা আপাতত সংযত আছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সৌদি আরব এই পথ দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ কমে যেতে পারে। তেল পরিবহনে তখন অনেক দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হবে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ—দুটোই বাড়বে। ক্রমবর্ধমান জাহাজভাড়া ও মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব পড়বে।
জ্বালানি বাজারবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জ সিএনএনকে বলেন, ‘বাব আল-মানদেব এত দিন বাণিজ্যের প্রাণের মতো কাজ করেছে। এই পথ হারানোর আশঙ্কা থেকে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতি কতটা অস্থিতিশীল।’
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের পাঁচ ভাগের প্রায় এক ভাগ এই পথ দিয়ে যেত। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া শুরু করে। সেখান থেকে তেল জাহাজে ভরে রপ্তানি করা হতো।
রিচার্ড ব্রোঞ্জের হিসাবে, একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল-মানদেব দিয়ে যেত। কিন্তু হুতিদের হামলার হুমকির কারণে আগস্টে বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি তেল পরিবহন প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। এখন তা আরও কমেছে বলে জানান ব্রোঞ্জ।
বাব আল-মানদেব এড়িয়ে এশিয়ায় তেল নিতে জাহাজগুলোকে এখন অনেকটা ঘুরপথে যেতে হচ্ছে। সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে যেতে হচ্ছে তাদের। এরপর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণে গিয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এশিয়ায় পৌঁছাতে হচ্ছে। এই পথে গেলে যাত্রার সময় প্রায় এক মাস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাড়ছে জাহাজভাড়া।
রিচার্ড ব্রোঞ্জ বলেন, ‘এশিয়ার অনেক শোধনাগার এখন বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। ফলে অন্যান্য অঞ্চলের তেলবাহী জাহাজের জন্য তারা বেশি দাম দিচ্ছে। তেলের দাম এত দ্রুত বাড়ার পেছনে এটাই বড় কারণ।’
বাব আল-মানদেবের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা হুতিদের দখলে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার তেলের দাম অনেকটা বেড়ে যায়। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারে উঠলেও পরে তা কমে ১০৪ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়েছে। ফলে গতকাল তেলের দাম মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।
বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল সিএনএনকে বলেন, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি আরব তেল উৎপাদন হ্রাস করেছে। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেন। সব মিলিয়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
জোহানেস রাউবাল সিএনএনকে বলেন, ‘দ্রুত সমাধানের লক্ষণ নেই। এই বিঘ্ন চলতে থাকলে শোধনাগারগুলোকে আরও বেশি অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করতে হবে। এতে তেলের দাম আরও বাড়বে।’অপরিশোধিত তেল থেকে ডিজেল তৈরি হয়। ট্রাক, ট্রাক্টর, মালবাহী ট্রেনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক যানবাহনে ব্যবহৃত ডিজেল বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এএএর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দেশটিতে ডিজেলের দাম এই প্রথম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোয় সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করেছে। এতে নীতি সুদহার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সুদের হার বাড়লে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণের খরচ বেড়ে যায়।
উল্লেখ্য, আগস্ট মাসে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। আগস্টেও মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ শতাংশের ওপরে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এমনিতেই চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি। তার মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে গেলে বিষয়টি হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।
লোহিত সাগর এড়িয়ে চলার অভিজ্ঞতা জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আগে থেকেই আছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে বাব আল-মানদেব দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুতিরা। এরপর জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই নৌপথ এড়িয়ে ঘুরপথে চলাচল শুরু করে। এতে পণ্য পরিবহনে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেশি সময় লেগেছে। পাশাপাশি জ্বালানি, বিমা ও নাবিকদের মজুরির খরচও বেড়ে যায়।
পণ্য পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ডের হিসাবে, এর পর থেকে বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে। গত দুই দিনে সংঘাত বেড়ে যাওয়ার পর এই পথে জাহাজ চলাচল আরও ৪৬ শতাংশ কমেছে। তবে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেন না পিটার স্যান্ড। তাঁর মতে, জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তবে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। পিটার স্যান্ড বলেন, ‘এই পথ দিয়ে চলাচল করা প্রতিটি জাহাজই সম্ভাব্য লক্ষ্য।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category