প্রভাত অর্থনীতি: বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রাখলেও ২০২৫ সালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে বাংলাদেশে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন। প্রতিযোগীরা যেখানে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে, সেখানে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে গতি হারাচ্ছে।
ডব্লিউটিও-এর প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মোট ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ২০২৪ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
অথচ একই সময়ে বিশ্ববাজারে পোশাকের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বৈশ্বিক চাহিদার এই ইতিবাচক ধারার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশের নিচে থাকা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে।
শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে কেবল চীন, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যান্য দেশের মধ্যে কম্বোডিয়া রেকর্ড ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এছাড়া পাকিস্তান ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ভারত ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়েছে।
রপ্তানি ধীরগতির কারণে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বও কমেছে। ২০২৪ সালে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের অংশীদারিত্ব ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়েছে। ভিয়েতনাম এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
শীর্ষে থাকা চীনের রপ্তানি ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ কমে ১৫৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ২০২১ সালে বিশ্ববাজারে চীনের অংশীদারিত্ব ছিল ৩১ দশমিক৭১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে কমে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া এই বাজারের বড় অংশই দখল করে নিয়েছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো।
তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রতিযোগী দেশগুলো যখন তাদের উৎপাদন সক্ষমতা এবং দক্ষতা বাড়াচ্ছে, তখন বাংলাদেশ নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের পোশাক খাত বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ।
এই সমস্যাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গ্রাফ বেশ ওঠানামা করছে। ২০২২ সালে দেশটিতে ২৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হলেও ২০২৩ সালে তা সংকুচিত হয়ে ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়। ২০২৪ সালে ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিলেও ২০২৫ সালে তা আবার ১ শতাংশের নিচে নেমে আসায় পুনরুদ্ধারের ধারা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, যদি দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো না যায়, তবে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম যেভাবে ব্যবধান কমিয়ে আনছে, তাতে বিশ্ব পোশাক বাজারে দ্বিতীয় স্থানের লড়াই এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের বাজার হিস্যাও টানা দুই বছর বেড়েছে। গত বছর দেশটি ১৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। ফলে বাজার হিস্যা ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে রপ্তানি কমে যাওয়ায় তুরস্কের বাজার হিস্যা কমেছে। গত বছর দেশটি ১৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম। এতে বাজার হিস্যা ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে।
বিশ্বের শীর্ষ ১০ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে গত বছর সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে কম্বোডিয়ার। দেশটির ১১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে তাদের বাজার হিস্যা ১ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক রপ্তানি যথাক্রমে সাড়ে ১০ ও ১৭ শতাংশ বাড়লেও বাংলাদেশের বেড়েছে ১ শতাংশের কম। এটি খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। কম্বোডিয়া ও ভারত সরকারি সহায়তায় আগ্রাসী বিপণন করছে। ভিয়েতনামও অনেক বেশি সংগঠিত। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পেশাদারি, দক্ষতা, পণ্য বৈচিত্র্য এবং দামি পণ্য উৎপাদনে দেশটি একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তুলেছে।
ফজলুল হক আরও বলেন, বাংলাদেশ কেন প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। তা না হলে দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। বৈশ্বিক তৈরি পোশাকের বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত একটি জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামকে মডেল হিসেবে নিতে পারে বাংলাদেশ।