• মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৯ অপরাহ্ন
Headline
ইসরায়েলের সাহায্যে কি তাহলে ইরানের ক্ষমতায় বসতে চেয়েছিলেন আহমাদিনেজাদ রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে এনবিআর ব্যবসা সম্প্রসারণে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, ধাপে ধাপে যুক্ত হচ্ছে ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ ২০২৫ সালে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ০.৮৯ শতাংশ প্রথমবারের মতো সি-ড্রোন দিয়ে ইরানের নৌঘাঁটিতে হামলা করল যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধে ১৪ মার্কিন সেনা নিহত, আহত চারশোর বেশি হরমুজে দুই জাহাজের সংঘর্ষ, ২৩ নাবিককে উদ্ধার করল ইরান ভারত-নেপাল সীমান্ত থেকে কথিত মার্কিন সেনা আটক হোয়াইট হাউসেও হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে ইরানের: আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার নেপালে জেন–জি নেতাদের ধরপাকড় এবং বালেন্দ্রর ওপর ক্ষোভ
টাইমস এক্সক্লুসিভ

ইসরায়েলের সাহায্যে কি তাহলে ইরানের ক্ষমতায় বসতে চেয়েছিলেন আহমাদিনেজাদ

Reporter Name / ১০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
নিউইয়র্কে ইহুদিবাদবিরোধী অতিরক্ষণশীল ইহুদি সংগঠন নেতুরেই কার্তার রেবাই মোশে বের বেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্ক টাইমস

হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ২০২৪ সালের শুরুর দিকে দেশটির সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত এক অনুরোধ পান।
কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলিকে জানান, লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিসে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি সম্মেলনের আয়োজন করতে হবে। সেই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাতে হবে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যিনি ব্যাপকভাবে বিতর্কিত।

এর কারণ ছিল আরও বিস্ময়কর। ওই কর্মকর্তা অধ্যাপক ডেলিকে জানান, সম্মেলনটি আসলে একটি অজুহাতমাত্র। এর আড়ালে বুদাপেস্টে ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করবেন আহমাদিনেজাদ। অথচ ইসরায়েলকে তিনি সব সময় প্রকাশ্যে শত্রু বলে মন্তব্য করে এসেছেন।
ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় ‘খুবই ব্যতিক্রমধর্মী’ ধারাবাহিক কয়েকটি বিশেষ অভিযান চালানোর কথা ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘আহমাদিনেজাদও সেই ধারাবাহিক পরিকল্পনার অংশ ছিলেন।’

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডেলি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, তিনি জানতেন এই আমন্ত্রণ তাঁর ব্যক্তিগত সুনাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তবু তাঁর বিশ্বাস ছিল, এর মাধ্যমে তিনি হয়তো মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি প্রচেষ্টার অংশ হতে পারবেন।

অধ্যাপক ডেলি বলেন, ‘দুপক্ষ যদি একে অপরের শত্রু হয়, আর তারা যদি কথা বলতে চায়, তাহলে তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়া ভালো।’
২০২৪ সালে আহমাদিনেজাদের বুদাপেস্টে ওই সফর এবং পরের বছরের আরেকটি সফর ছিল ইসরায়েলের অনেক বছরের এক গোপন পরিকল্পনার অংশ। এ পরিকল্পনার বিষয়ে জানেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এমন একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইসরায়েল আহমাদিনেজাদকে এমন একটি গোয়েন্দা সম্পদে পরিণত করতে চেয়েছিল, যাকে উপযুক্ত সময়ে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আহমাদিনেজাদকে নিজেদের পক্ষে আনাকে ইসরায়েল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল যে ২০২৪ সালে দেশটির তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান ডেভিড বারনিয়া নিজে বুদাপেস্টে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর কিছুদিন পর ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে (সিআইএ) জানায়, তারা আহমাদিনেজাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে।

আহমাদিনেজাদকে ঘিরে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা তৈরি করার সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের জন্য ছিল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়েছিলেন, নিয়মিত ইসরায়েলকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং হলোকাস্ট (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর নাৎসি গণহত্যা) অস্বীকার করেছিলেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল গোপনে আহমাদিনেজাদের বাসস্থান ও বিদেশ সফরের ব্যয় বহন করেছে। বুদাপেস্ট সফরসহ বিদেশে বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তাঁর সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও করেছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে, এই প্রচেষ্টার চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয়। তেহরানে কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকা আহমাদিনেজাদকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি সাহসী অভিযান চালায় ইসরায়েল। উদ্দেশ্য ছিল বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের পরিকল্পনা কার্যকর করা এবং আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানো।
ব্যর্থ পরিকল্পনা তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের এক বিমান হামলায় আহমাদিনেজাদের বাসভবনকে নিশানা করা হয়। হামলায় তাঁর দেহরক্ষীদের ভবন ও বুলেটপ্রুফ একটি গাড়ি লক্ষ্য করা হয়েছিল। ইরানের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, হামলার পর ঘটনাস্থলে একটি কালো রঙের প্যুজো গাড়ি এসে আহমাদিনেজাদকে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।

অভিযান সম্পর্কে অবগত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, মোসাদের সদস্যরা গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। তাঁরা আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরে একটি গোপন নিরাপদ আস্তানায় নিয়ে যান।

তবে ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এই তড়িঘড়ি উদ্ধার অভিযানে আহমাদিনেজাদ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁকে আবার ক্ষমতায় বসানোর ইসরায়েলের পরিকল্পনা নিয়েও তাঁর মধ্যে সংশয় তৈরি হয়।

এরপর আহমাদিনেজাদ কীভাবে সেই নিরাপদ আস্তানা ছেড়েছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত সোমবার (৬ জুলাই) ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার অনুষ্ঠানে আহমাদিনেজাদকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। এর আগপর্যন্ত তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

বর্তমানে আহমাদিনেজাদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর আহমাদিনেজাদ এখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে রয়েছেন। তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে।

তেহরানের বর্তমান সরকারকে উৎখাতের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহমাদিনেজাদকে ইরানের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

এই পরিকল্পনার আরেকটি অংশ ছিল ইরাকের উত্তরাঞ্চলে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি যোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে প্রবেশ করানো, সেখানে কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং পরে রাজধানী তেহরানের দিকে অগ্রসর হওয়া। তবে সেই পরিকল্পনাও কখনো আলোর মুখ দেখেনি।

এই পরিকল্পনায় আহমাদিনেজাদের ভূমিকার তথ্য সবার আগে প্রকাশ করেছিল নিউইয়র্ক টাইমস। এরপর গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ফায়ারিং লাইনে’ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হাইমান বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় ‘খুবই ব্যতিক্রমধর্মী’ ধারাবাহিক কয়েকটি বিশেষ অভিযান চালানোর কথা ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘আহমাদিনেজাদও সেই ধারাবাহিক পরিকল্পনার অংশ ছিলেন।’

বদলে যাওয়া আহমাদিনেজাদ

মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সে সময় তিনি দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েলকে ধ্বংস করার কথা বলতেন। তাঁর শাসনামলে ইরান নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করে। এটা গোপনে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা নিয়ে সন্দেহকে আরও জোরালো করেছিল।

২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদ আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর আমলে বিচার বিভাগ অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং বিরোধী নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বন্দী করে।

তবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পর ধীরে ধীরে আহমাদিনেজাদের অবস্থানে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তিনি আগের তুলনায় অনেক সংযত হন এবং ইসরায়েলবিরোধী কড়া বক্তব্যও কমিয়ে দেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বক্তৃতায় তিনি ইরানের পপ–সংস্কৃতি নিয়ে মতামত দেন, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমননীতির সমালোচনা করেন এবং শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন।

নিজের পোশাক-পরিচ্ছদেও পরিবর্তন আনেন আহমাদিনেজাদ। দীর্ঘদিনের পরিচিত ঢিলেঢালা খয়েরি জ্যাকেট ছেড়ে পরতে শুরু করেন মাপমতো স্যুট। অগোছালো দাড়িও ছেঁটে-গুছিয়ে রাখতেন। এমনকি তিনি বোটক্স চিকিৎসা (মুখের বলিরেখা কমানোর চিকিৎসা) নিয়েছেন বলেও ধারণা করা হয়। পাশাপাশি ইংরেজি শেখাও শুরু করেন।

তেহরানে নিজের কার্যালয়ে প্রতিদিন সকালে ঘণ্টাব্যাপী জনসাধারণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন আহমাদিনেজাদ। সাধারণ মানুষ তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে আসতেন। কেউ কেউ সরকারি জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা চাইতেন। কখনো কখনো তিনি সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোতে চিঠি লিখে ঋণের আবেদনকারীদের সুপারিশও করতেন। একই সঙ্গে তিনি নিয়মিত দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামীণ এলাকায় ঘুরে সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করতেন।

ইরানের সরকারের সঙ্গে আহমাদিনেজাদের সম্পর্ক ছিল জটিল। শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁকে একঘরে করে রাখে এবং তাঁর চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করে। তবে সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়া উচ্চপর্যায়ের একটি পরিষদে অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁকেও সদস্য হিসেবে রাখা হয়। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে, ফেব্রুয়ারি মাসেও তিনি ওই পরিষদের বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।

ইরানের অনেকে আহমাদিনেজাদের এই পরিবর্তনকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা এবং ক্ষমতাসীনদের থেকে দূরত্ব দেখানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এই নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তুলছিলেন। শ্রমজীবী মানুষের একটি অংশের মধ্যে তাঁর সমর্থন ছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের বিশ্বাস ছিল, তিনি কোনো একদিন আবার ক্ষমতায় ফিরতে চান।

ফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আহমাদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আবদোলরেজা দাভারি বলেন, ‘আহমাদিনেজাদ অর্থের জন্য এমন কিছু করবেন না। তাঁর অর্থ আছে, বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও আছে। তিনি এটা ক্ষমতার জন্য করতে পারেন। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চান।’ কয়েক বছর আগে আবদোলরেজার সঙ্গে আহমাদিনেজাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যক্তিগত আলাপের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিদেশি শক্তির সহায়তায় ভবিষ্যতে ইরানের নেতা হওয়ার ইচ্ছার কথা আহমাদিনেজাদ তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে জানিয়েছিলেন।

ওই সহযোগীর ভাষ্যমতে, তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি না পাওয়ার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি আহমাদিনেজাদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, বর্তমান ব্যবস্থা বহাল থাকলে তাঁর পক্ষে আর ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয়।

যুদ্ধ ও সরকার পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো ইরানের বাইরে থাকা এমন কোনো বিরোধী নেতাকে বেছে নেবে, যিনি দেশের বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত নন—আহমাদিনেজাদের এমন আশঙ্কাও ছিল। এতে ইরান আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করতেন।

নিজের ঘনিষ্ঠদের কাছে সাবেক এই প্রেসিডেন্ট বলতেন, তিনি রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মতো একজন সংস্কারকের ভূমিকা পালন করতে পারেন। ক্ষমতায় এলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির অংশ হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।

সে সময় আহমাদিনেজাদ ও ইরানের শাসনব্যবস্থার মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের বিষয়টি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। সে সময়কার গোয়েন্দা মূল্যায়ন সম্পর্কে অবগত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতের দুজন কর্মকর্তা বলেন, বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ নেতার প্রতি আহমাদিনেজাদের ক্ষোভ তাঁদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কারণ, তাঁরাই তাঁকে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেননি।

অন্যদিকে আহমাদিনেজাদের কর্মকাণ্ড আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখারও সন্দেহ বাড়িয়ে তুলেছিল। বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করাই সংস্থাটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

আইআরজিসির দুজন সদস্য এবং এ ঘটনার সঙ্গে পরিচিত একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, ২০১৭ সাল থেকে আহমাদিনেজাদ প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন। পরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকেও চিঠি লেখেন। ট্রাম্প তখন দুই নেতারই প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছিলেন।

চলতি বছরের ইসরায়েলি হামলার পর আহমাদিনেজাদ যখন সাময়িকভাবে আইআরজিসির নজরদারির বাইরে চলে যান, তখন ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁর সঙ্গে ইসরায়েলের যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু করে। চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, তদন্তে ধীরে ধীরে সেই যোগাযোগের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।

বিদেশ সফরে গোপন বৈঠক

ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ঠিক কবে থেকে আহমাদিনেজাদকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা শুরু করেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের কর্মকর্তারা বলেন, ২০২৩ সালে পরিবেশবিষয়ক একটি সম্মেলনে যোগ দিতে গুয়াতেমালা সফরের সময় তাঁদের মধ্যে খুব সম্ভবত প্রাথমিক যোগাযোগ হয়েছিল। তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল গুয়াতেমালা সরকার। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে গুয়াতেমালার কূটনৈতিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ।

তবে ওই সফর প্রায় ভেস্তে যাচ্ছিল। তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনী আহমাদিনেজাদকে বোর্ডিং পাস দিতে এবং দেশ ছাড়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।

এর প্রতিবাদে আহমাদিনেজাদ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরেই অবস্থান করেন। ঘটনাটি দ্রুত জনসমক্ষে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি সাধারণ যাত্রী, বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থার কর্মীদের সঙ্গে ছবি তোলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপডেট দিতে থাকেন।

শেষ পর্যন্ত ইরানি কর্তৃপক্ষ আহমাদিনেজাদকে উড়োজাহাজে উঠতে এবং সম্মেলনে অংশ নিতে অনুমতি দেয়।

সফরকালে প্রকাশিত এক ভিডিওতে আহমাদিনেজাদ বলেন, ‘কিছু মানুষ আমাকে গুয়াতেমালা যেতে নিষেধ করেছিল। আমি তাঁদের বলেছি, আমার ভাই, দেশটির পরিবেশমন্ত্রী, আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। লাতিন আমেরিকায় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।’

পরের বছর আহমাদিনেজাদ প্রথমবারের মতো হাঙ্গেরি সফরে যান। বুদাপেস্টে লুডোভিকা ইউনিভার্সিটির সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আড়ালে তিনি মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বারনিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। গত মাস পর্যন্ত পাঁচ বছর তিনি মোসাদের নেতৃত্বে ছিলেন।

সে সময় হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডানপন্থী নেতা ভিক্টর অরবান। ইউরোপের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর সরকারের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। অরবান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে অপরের দেশ সফরও করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহু লুডোভিকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁকে জনসেবায় বিশেষ সম্মাননা দেয়।

এর দুই মাস পর ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে আবারও বুদাপেস্টে যান আহমাদিনেজাদ। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ছিল আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় সফর। তবে প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা।

বিদেশ সফরে সব সময় আইআরজিসির আনসার ইউনিটের দেহরক্ষীরা আহমাদিনেজাদের সঙ্গে থাকতেন। তাঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুনের ওই সফরে অন্তত দুবার আহমাদিনেজাদ নিরাপত্তারক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাঁরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে আহমাদিনেজাদ বলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। আইআরজিসির দুজন সদস্য এবং এ ঘটনার সঙ্গে পরিচিত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে আহমাদিনেজাদ ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন। এতে উপস্থিত ব্যক্তিরা বিস্মিত হন। কারণ, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে প্রতিটি বক্তৃতার শুরুতে তিনি কোরআনের আয়াত পাঠ করতেন। কিন্তু এবার তা করেননি।

গাঢ় নীল রঙের মাপমতো স্যুট পরে আহমাদিনেজাদ ‘অভিন্ন মানবতা’ এবং ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা’ নিয়ে কথা বলেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নিজের মতামত তুলে ধরছেন।

আহমাদিনেজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর গেরগেলি ডেলিকে প্রাচীন ইরানি কবি ফেরদৌসির ‘শাহনামা’ উপহার দেন। জবাবে ডেলি তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্মারকচিহ্ন তুলে দেন।

গত মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেলি বলেন, আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তিনি মূলত একজন ‘স্ট্রোহমানের’ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জার্মান শব্দটির অর্থ হলো, এমন একজন ব্যক্তি, যিনি অন্য কোনো গোপন পরিকল্পনার আড়াল বা মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হন।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তেহরানে নিজের বাড়ি থেকে কালো প্যুজো গাড়িতে করে সরিয়ে নেওয়ার পর গত সপ্তাহ পর্যন্ত আহমাদিনেজাদকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

গত সোমবার হঠাৎ সাবেক এই প্রেসিডেন্ট ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য উপস্থিত হন। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তাঁর গায়ে ছিল মোটা জ্যাকেট। সার্জিক্যাল মাস্কটি থুতনির নিচে নামানো ছিল। ইরানের জীবিত অন্য দুই সাবেক প্রেসিডেন্ট—হাসান রুহানি ও মোহাম্মদ খাতামিকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তাঁদের কাউকে সেখানে দেখা যায়নি।

খামেনির শেষবিদায় অনুষ্ঠানে আহমাদিনেজাদ মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চারপাশে থাকা কয়েকজন ব্যক্তিকে নিরাপত্তারক্ষী বলে মনে হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category