প্রভাত রিপোর্ট: জটিল নীতিমালা, দীর্ঘসূত্রতা ও বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে এলপিজি খাতের উদ্যোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।এমন মন্তব্য করে এসব ভোগান্তি নিরসনে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু এবং ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। রবিবার (১৭ মে) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভবনে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ও লোয়াব কর্তৃক আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান, বিইআরসি সদস্য (পেট্রোলিয়াম) সুলতানা রাজিয়া, এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা আমজাদসহ আরও অনেকে।
বক্তব্যে লোয়াব প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশে যখন প্রকৃতিক গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কমে যায়,তখন সরকার ২০০৯/২০১০ সাল নাগাদ নতুন সিএনজি স্টেশন এবং গৃহস্থলি সংযোগ বন্ধ করে দিলো। সে সময় বিকল্প হিসেবে এলপিজি অটোগ্যাস ব্যবহার বাড়তে থাকলো। কিন্ত প্রয়োজনীয় নীতিমালা না থাকায় তেমন একটা প্রসার হয়নি, ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারাদেশে মাত্র ১৫/২০ টা এলপিজি অটোগ্যাস স্থাপন হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দিনদিন তীব্র হতে থাকলে এবং তার বিপরীতে রান্নার কাজে এলপিজি ব্যাবহার জনপ্রিয় হলে ২০১৫-১৬ সালের দিকে সরকার সিদ্ধান্ত নিলো যে, যানবাহনে এলপিজি ব্যাবহার করলে সিএনজি ষ্টেশনের ওপর চাপ কমবে এবং জনগণ সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব জ্বলানি হিসেবে গাড়িতে এলপিজি ব্যাবহার করবে। এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এলপিজি অটোগ্যাস ষ্টেশন স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা-২০১৬ প্রণয়ন করা হয় এবং উদ্যোক্তাদের এলপিজি অটোগ্যাস স্থাপনে উৎসাহিত করা হয়। নীতিমালা প্রণয়নের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ১ হাজার এলপিজি অটোগ্যাস স্থাপনের জন্য বিষ্ফোরক পরিদপ্তর থেকে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়, যার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়। নীতিমালা অনুসারে প্রথমে নকশা অনুমোদন নিতে হয় এবং ১২-১৮ মাসের মধ্যে মেশিনারিজ স্থাপন করতে হয়। স্থাপন করার পর বিষ্ফোরক পরিদপ্তর এবং তারপর বিইআরসি থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। তিনি আরও বলেন, প্রধান সমস্য হলো নীতিমালা অনুযায়ী নকশা/প্রথমিক অনুমোদনের যে শর্তাবলী, সেগুলো অনুসরণ করা অনেকটা অসম্ভব ছিল এবং বাস্তবে অনুসরণ হয়নি। ফলে ষ্টেশন স্থাপনের পর লাইসেন্স নিতে গিয়ে ২০২১/২২ সালের পর থেকে যখন বিষ্ফোরক প্রধান হিসাবে মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়েছে তখন থেকে লাইসেন্স পাওয়া সাধারণ উদ্যোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে গেল।
লোয়াব প্রেসিডেন্ট বলেন,বর্তমানে প্রায় ৭০০ অটোগ্যাস ষ্টেশন বিষ্ফোরক এবং বিইআরসির লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় আছে,যা অতি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।নীতিমালা ও বিধিমালার শর্তাবলী পালন করে ষ্টেশন স্থাপন ও পরিচালনা করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে প্রাথমিক নকশা অনুমোদন পেতে বছরের পর বছর বিষ্ফোরক পরিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ, ডিসি অফিস, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়, যার ফলে সময় নষ্ট এবং বিনিয়োগের বড় অংশ বিবিধ খরচ হিসাবে ব্যয় হয়ে যায়। তিনি বলেন,অধিকাংশ এলপিজি অপারেটর নানবিধ সমস্যার কারনে এলপিজি আমদানী করতে না পারায় বেশীরভাগ সময় চুক্তিকৃত অপারেটরের মাধ্যমে এলপিজি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।সিএনজির মত এলপিজি ষ্টেশন ও কনভার্শনের জন্য আমদানীকৃত মালামালে শুল্ক ছাড়ের সুপারিশ থাকা সত্বেও বিভিন্ন দপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে জটিলতার কারনে সুবিধা নেওয়া যায়না। এইসব ব্যাপারে বিভিন্ন দপ্তরে মিটিং করেও কোন লাভ হয়নি।
বর্তমানে এই সেক্টরে প্রায় ১ হাজার ষ্টেশন স্থাপনে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে, এখানে প্রায় সবাই এসএমই উদ্যোক্তা এবং অধিকাংশ বিনিয়োগ ব্যাংক লোনের মাধ্যমেই করা। প্রায় ২ লাখ যানবাহন আছে, যেগুলো এলপিজিতে কনভার্ট হয়েছে। কিন্তু এসব সমস্যার কারণে উদ্যোক্তা এবং গ্রাহক সবাই ভুক্তভোগী।
আলোচনায় লোয়াবের পক্ষ থেকে যেসব সুপারিশ জানানো হয় : ১. এলপিজি নীতিমালা ও বিধিমালা বাস্তবতার আলোকে সংশোধন করে নকশা অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া হয়রানিমুক্ত ও সহজীকরণ করা। ২. একটা রেগুলেটরি অথরিটি নির্ধারণ করে তার অধীনে সব ধরনের ফিলিং ষ্টেশনের জন্য একটা সেল/দপ্তর গঠন করে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সেবা দেয়া। ৩. উন্নত দেশের মতো অটোমেশন করে ডিজিটাল লাইসেন্সিং সেবা দেয়া। অর্থাৎ, যাবতীয় শর্তাবলী পূরণ সাপেক্ষে কোনো ধরনের ডেস্কের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়াই লাইসেন্স হবে। ৪. কোনো অপারেটর এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ করতে না পারলে ষ্টেশন মালিক যেন অন্য অপারেটর থেকে সহজে এলপিজি নিতে পারেন, এজন্য ডিলারশিপ চুক্তির মধ্যে শর্ত শিথিল থাকা নিশ্চিত করা।