প্রভাত বিনোদন: আইরিশ গ্রামের দরিদ্র শৈশব থেকে হলিউডের কোটি ডলারের তারকা—পিয়ার্স ব্রসনানের জীবন যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। শনিবার (১৬ মে) ছিল তাঁর জন্মদিন। একসময় যিনি বাবার পরিচয় ছাড়াই বড় হয়েছেন, স্কুলজীবনে বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন, সেই মানুষটিই পরে হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘জেমস বন্ড’দের একজন। অভিনয়, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, প্রেম, সংগ্রাম আর পুনর্জন্মের গল্পে ভরা তাঁর জীবন।
আসলে পিয়ার্স ব্রসনান অনেক আগেই বন্ড হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়েই প্রযোজকেরা তাঁকে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু ‘রেমিংটন স্টিল’ সিরিজের চুক্তিগত জটিলতার কারণে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়। শেষ পর্যন্ত বন্ড চরিত্রে নেওয়া হয় টিমোথি ডালটনকে। সেই ব্যর্থতা ব্রসনানকে হতাশ করেছিল। কিন্তু তিনি অপেক্ষা থামাননি। অবশেষে ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় ‘গোল্ডেন আই’। আর প্রথমবারের মতো জেমস বন্ড হিসেবে হাজির হন পিয়ার্স ব্রসনান। ঠান্ডা মেজাজ, নিখুঁত স্টাইল, ব্যঙ্গাত্মক হাসি আর আধুনিক অ্যাকশন—সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের বন্ড হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ সালের ১৬ মে আয়ারল্যান্ডের ছোট শহর ড্রোগেডায় জন্ম পিয়ার্স ব্রসনানের। খুব ছোট বয়সেই তাঁর পরিবার ভেঙে যায়। বাবা টমাস ব্রসনান পরিবার ছেড়ে চলে যান, তখন পিয়ার্সের বয়স মাত্র এক বছর। মা মে ব্রসনান সংসার চালাতে লন্ডনে নার্সের কাজ নিতে বাধ্য হন। ফলে শিশুপুত্রকে আত্মীয়দের কাছে রেখে যেতে হয়েছিল তাঁকে।
পিয়ার্স পরে বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শৈশবের সেই একাকিত্ব তাঁকে গভীরভাবে বদলে দেয়। কখনো নানা-নানির কাছে, কখনো খালার কাছে—এভাবেই বড় হয়েছেন। নিজের বাবার সঙ্গে প্রায় কোনো সম্পর্কই ছিল না। বহু বছর পর একবার বাবার সঙ্গে দেখা হলেও সম্পর্ক আর গড়ে ওঠেনি।
শৈশবে পিয়ার্সকে প্রায়ই শুনতে হতো, ‘বাবাহীন ছেলে।’ স্কুলে সহপাঠীদের বিদ্রূপও সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু সেই কষ্টই তাঁকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। কৈশোরে মা তাঁকে লন্ডনে নিয়ে আসেন। নতুন শহর, নতুন জীবন, কিন্তু সংগ্রাম তখনো শেষ হয়নি।
কৈশোরে পিয়ার্সের শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি প্রথমে বাণিজ্যিক শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। একসময় সার্কাসে আগুনখেকোর কাজও শিখেছিলেন। পরে যোগ দেন অভিনয়ের প্রশিক্ষণকেন্দ্র ড্রামা সেন্টার লন্ডনে। সেখান থেকেই শুরু হয় অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা।
সত্তরের দশকে থিয়েটারে অভিনয় করতে করতে ধীরে ধীরে টেলিভিশনে সুযোগ পান। ছোট চরিত্র দিয়ে শুরু হলেও তাঁর ব্যক্তিত্ব, কণ্ঠ আর পর্দার উপস্থিতি দ্রুত নজর কাড়ে। আশির দশকে টিভি সিরিজ ‘রেমিংটন স্টিল’ পিয়ার্সকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। স্মার্ট, রসিক, স্টাইলিশ গোয়েন্দার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকের প্রিয় হয়ে ওঠেন। তখন থেকেই অনেকের ধারণা ছিল, এই মানুষটিই একদিন জেমস বন্ড হবেন।
‘জেমস বন্ড’–এর বাইরে পিয়ার্স ব্রসনানের অভিনয়জীবনও সমৃদ্ধ। তিনি রোমান্টিক, কমেডি, মিউজিক্যাল, থ্রিলার—সব ধরনের সিনেমায় কাজ করেছেন। বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয় ‘মাম্মা মিয়া!’। এখানে মেরিল স্ট্রিপের সঙ্গে ব্রসনানের রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করে। এ ছাড়া ‘দ্য টমাস ক্রাউন অ্যাফেয়ার’, ‘দ্য গোস্টরাইটার’, ‘ব্ল্যাক অ্যাডাম’সহ নানা ছবিতে অভিনয় করেছেন ব্রসনান। বয়স বাড়লেও তাঁর কাজের গতি কমেনি; বরং এখন তিনি বেশি বেছে বেছে কাজ করেন।
আসলে পিয়ার্স ব্রসনান অনেক আগেই বন্ড হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়েই প্রযোজকেরা তাঁকে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু ‘রেমিংটন স্টিল’ সিরিজের চুক্তিগত জটিলতার কারণে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়। শেষ পর্যন্ত বন্ড চরিত্রে নেওয়া হয় টিমোথি ডালটনকে। সেই ব্যর্থতা ব্রসনানকে হতাশ করেছিল। কিন্তু তিনি অপেক্ষা থামাননি। অবশেষে ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় ‘গোল্ডেন আই’। আর প্রথমবারের মতো জেমস বন্ড হিসেবে হাজির হন পিয়ার্স ব্রসনান। ঠান্ডা মেজাজ, নিখুঁত স্টাইল, ব্যঙ্গাত্মক হাসি আর আধুনিক অ্যাকশন—সব মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের বন্ড হয়ে ওঠেন তিনি।
ব্রসনানের ‘বন্ড’ ছিল পুরোনো ভদ্রলোকি আভিজাত্য আর আধুনিক অ্যাকশনের মিশ্রণ। তাঁর অভিনীত চারটি বন্ড সিনেমা ‘গোল্ডেন আই’, ‘টুমরো নেভার ডাইজ’, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ নট অ্যানাফ’, ‘ডাই অ্যানাদার ডে’ বিশ্বজুড়ে বিপুল ব্যবসা করে।
বিশেষ করে ‘গোল্ডেন আই’কে ধরা হয় ‘বন্ড’ ফ্র্যাঞ্চাইজির পুনর্জন্ম হিসেবে। কারণ, দীর্ঘ বিরতির পর এই সিনেমাই ‘জেমস বন্ড’ ফ্র্যাঞ্চাইজিকে আবার জনপ্রিয় করে তোলে।
পিয়ার্স ব্রসনানের ‘বন্ড’ ছিল পরিশীলিত, রোমান্টিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন ‘পারফেক্ট জেন্টলম্যান স্পাই’। তবে সমালোচকেরা কখনো কখনো বলেছেন, তাঁর শেষ দিকের ‘বন্ড’ সিনেমাগুলো অতিরিক্ত গ্যাজেটনির্ভর হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে ‘ডাই অ্যানাদার ডে’ মুক্তির পর ফ্র্যাঞ্চাইজিকে নতুনভাবে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন নির্মাতারা। এরপর বন্ড চরিত্রে আসেন ড্যানিয়েল ক্রেগ। পরে ব্রসনান মজা করে বলেছিলেন, ‘আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।’ তবে সময়ের সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, পরিবর্তনটা প্রয়োজন ছিল।
সফলতার মধ্যেও ব্যক্তিগত জীবনে ভয়াবহ আঘাত এসেছে পিয়ার্স ব্রসনানের জীবনে। ১৯৮০ সালে অভিনেত্রী ক্যাসান্দ্রা হ্যারিসকে বিয়ে করেন তিনি। ক্যাসান্দ্রার আগের সংসারের দুই সন্তানকেও নিজের সন্তানের মতো বড় করেন ব্রসনান। পরে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে শন। কিন্তু সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ক্যাসান্দ্রা ক্যানসারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৯১ সালে মারা যান তিনি। তখন ব্রসনান পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন।
ব্রসনান পরে বলেছেন, জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময় ছিল সেটি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন বিষণ্নতায় ভুগেছেন। দুর্ভাগ্য এখানেই শেষ হয়নি। ক্যাসান্দ্রার মেয়ে শার্লটও পরে একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। একই পরিবারের একাধিক মানুষকে ক্যানসারে হারানোর যন্ত্রণা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। দীর্ঘ শোকের পর সাংবাদিক ও টিভি উপস্থাপক কেলি শায়ে স্মিথের সঙ্গে পরিচয় হয় ব্রসনানের। ধীরে ধীরে তাঁদের সম্পর্ক গভীর হয়। ২০০১ সালে তাঁরা বিয়ে করেন।
হলিউডে দীর্ঘস্থায়ী সুখী দাম্পত্যের উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই তাঁদের নাম আসে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ত্রীকে নিয়ে ভালোবাসার পোস্ট দেন ব্রসনান। বয়স, ওজন বা চেহারা নিয়ে স্ত্রীকে আক্রমণ করে করা ট্রলের বিরুদ্ধেও তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁদের দুই ছেলে ডিলান ও প্যারিস এখন মডেলিং ও চলচ্চিত্রজগতে কাজ করছেন।
অনেকেই জানেন না, পিয়ার্স ব্রসনান পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত। সমুদ্রদূষণ, তিমি শিকার বন্ধ ও জলবায়ু সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। হাওয়াইয়ে সমুদ্র রক্ষাবিষয়ক আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। তাঁর মতে, পৃথিবীকে বাঁচানো এখন মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ‘জেমস বন্ড’–এর বাইরে পিয়ার্স ব্রসনানের অভিনয়জীবনও সমৃদ্ধ। তিনি রোমান্টিক, কমেডি, মিউজিক্যাল, থ্রিলার—সব ধরনের সিনেমায় কাজ করেছেন।
বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয় ‘মাম্মা মিয়া!’। এখানে মেরিল স্ট্রিপের সঙ্গে ব্রসনানের রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করে।
এ ছাড়া ‘দ্য টমাস ক্রাউন অ্যাফেয়ার’, ‘দ্য গোস্টরাইটার’, ‘ব্ল্যাক অ্যাডাম’সহ নানা ছবিতে অভিনয় করেছেন ব্রসনান। বয়স বাড়লেও তাঁর কাজের গতি কমেনি; বরং এখন তিনি বেশি বেছে বেছে কাজ করেন।
হলিউডের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিপুল সম্পদ গড়েছেন পিয়ার্স ব্রসনান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২০–২৫ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। ক্যালিফোর্নিয়া, হাওয়াই ও ইউরোপে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। শিল্পকর্ম সংগ্রহেও আগ্রহ আছে তাঁর। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকেও আয় করেন তিনি।
তবে বিলাসী জীবনযাপনের চেয়ে পরিবার আর সমুদ্রের কাছে শান্ত সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করেন ব্রসনান। ৭০ পেরিয়েও থেমে নেই পিয়ার্স ব্রসনান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বিভিন্ন সিরিজ ও সিনেমায় অভিনয় করছেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পর্দা-ব্যক্তিত্ব আরও গম্ভীর ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে।
ব্রসনান এখন বেশি সময় দেন পরিবার, চিত্রাঙ্কন ও পরিবেশবিষয়ক কাজকে। অনেকেই জানেন না, অভিনয়ের বাইরে তিনি দক্ষ চিত্রশিল্পীও। নিজের আঁকা ছবি প্রদর্শনীতেও স্থান পেয়েছে। আইএমডিবি, ভ্যারাইটি অবলম্বনে