মো:মাহবুবুর রহমান,পাথরঘাটা: বরগুনার পাথরঘাটায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলের মৎস্য খাত, স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জুলাই মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পাথরঘাটার অর্থনীতি মূলত মৎস্যনির্ভর। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারগুলোতে মাছ সংরক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় বরফকলগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। এতে জেলে, ট্রলার মালিক ও বরফকল ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
পাথরঘাটার খাজা বরফকলের মালিক মিহির কুমার আশ বলেন, “আমার বরফকলে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করেন। বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের বসিয়ে বসিয়ে মাসিক বেতন দিতে হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিক ছাঁটাই করে বরফকল বন্ধ রাখতে বাধ্য হব। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার চালু করব।
পাথরঘাটা বাজারের ইলেকট্রনিক্স মেকার মো. নূরে আলম মুন্সী বলেন, “হার্ডওয়্যার ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন বৈদ্যুতিক মেশিন মেরামতের কাজ করি। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো মেশিন চালিয়ে কাজ করা যাচ্ছে না। অনেক মেশিন জমে আছে। গ্রাহকরা প্রতিদিন এসে মেশিন চাইছেন, কিন্তু দিতে পারছি না। এতে আমার যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি যাদের এসব মেশিন দিয়ে জীবিকা চলে তারাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শিবু বসু বলেন, “সারাদিন মোটামুটি কিছুটা বিদ্যুৎ থাকলেও রাতে প্রায় সময় থাকেই না। প্রচণ্ড গরমে ঘুমানো যায় না। সন্তানদের পড়াশোনারও ক্ষতি হচ্ছে। রাতে ঘুমাতে না পেরে দিনের বেলায় দোকানে এসে বিশ্রাম নিতে হয়। এতে ব্যবসায় মনোযোগও নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ না থাকলেও জুলাই মাসে অস্বাভাবিক বিল আসার অভিযোগ করেছেন অনেক গ্রাহক। নিজাম উদ্দিন নামে এক গ্রাহক বলেন, আমার বাসায় সাধারণত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। কিন্তু জুলাই মাসে বিল এসেছে ১ হাজার ২৫০ টাকা। বিদ্যুৎ ঠিকমতো না পেয়েও এত বেশি বিল কেন এসেছে, তা বুঝতে পারছি না।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও অনেক গ্রাহক। তাদের দাবি, প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিল পুনর্মূল্যায়ন করা হোক।
পাথরঘাটা কে.এম. মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী চন্দন সাহা বলেন, দিন-রাত বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করতে পারছি না। গরমে রাতে ঘুম হয় না। ফলে সারাদিন শরীর ক্লান্ত লাগে এবং স্কুলে গিয়েও পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারি না।
বর্তমানে চায়ের দোকান, বাজার কিংবা জনসমাগমস্থলে একটাই আলোচনার বিষয়—পাথরঘাটার লোডশেডিং। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন বিদ্যুৎ থাকার চেয়ে না থাকাই যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে; মাঝে মধ্যে কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ আসে।
এ বিষয়ে পাথরঘাটা পল্লী বিদ্যুতের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আরিফ শাহরিয়ার বলেন, “পাথরঘাটা সাবস্টেশনের উন্নয়নকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। আশা করছি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ হবে। কাজটি সম্পন্ন হলে পাথরঘাটাবাসী নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাবেন এবং দীর্ঘদিনের ভোল্টেজ সমস্যারও সমাধান হবে।”