• বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৮ পূর্বাহ্ন
Headline
বদলেছে পাতায়া, তারপরও আসছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্য ১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে: সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের অষ্টম-নবম শ্রেণির বই কিনতে ৭৩৯ কোটি টাকা অনুমোদন ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করতে ৪৪৫ কোটি টাকার তেল-ডাল কিনছে সরকার মাদক ও নৈতিকতাহীনতা থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসার ওপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করল যুক্তরাষ্ট্র বাড়লো সয়াবিন তেলের দাম, কমলো এলপিজির দাম যানজট কমাতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে যাবে: স্পিকার হুমকি মোকাবিলায় দেশেই ড্রোন তৈরি করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

বড় বাজেট, বড় স্বপ্ন

Reporter Name / ৭৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করেছে। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ গত তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও অনেক বেশি সতর্ক পূর্বাভাস দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি, উচ্চ সুদহার, রাজস্ব ঘাটতি ও বেসরকারি খাতের দুর্বল অবস্থার মধ্যে এই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা— যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। তবে এই বাজেটকে ঘিরে যেমন রয়েছে উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা, তেমনি রয়েছে রাজস্ব আহরণ, ঋণনির্ভরতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন।
নতুন বাজেটের মূল বার্তা হলো— করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বৃদ্ধি, অর্থনীতিকে আরও আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা। তবে একই সঙ্গে এটি একটি বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট, যার প্রভাব আগামী অর্থবছরে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অনুভূত হতে পারে।

করছাড়ের ছড়াছড়ি, কিন্তু করজালও বিস্তৃত

এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্যাপক কর ও ভ্যাট ছাড়। সরকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী এবং প্রযুক্তিপণ্যে কর রেয়াত দিচ্ছে।
ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর কমানো হচ্ছে। সারের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার, কীটনাশকে শুল্ক ছাড় এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগও থাকছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হার্টের রিং, চোখের লেন্স, কিডনি ডায়ালাইসিসের উপকরণ এবং ক্যানসারের ওষুধ তৈরির কাঁচামালে শুল্ক ও ভ্যাট ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা কমতে পারে।
একই সঙ্গে মোবাইল সিমে বিদ্যমান ৩০০ টাকার সুনির্দিষ্ট কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার মনিটর, মেমোরি কার্ড, প্রিন্টার, ফ্রিজসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে কর কমানো হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি সম্প্রসারণে সংগীত, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক শিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো আইনি স্বীকৃতি পাচ্ছে। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও ভ্যাট সুবিধা থাকছে।

কর বাড়ছে না, কিন্তু নজরদারি বাড়ছে

সরকার বলছে করহার নয়, করদাতার সংখ্যা বাড়ানোই এবারের লক্ষ্য। সেই কারণে ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যবসায়িক ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে টিআইএন, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) ও ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এনবিআরের তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ভূমি অফিস, ইউটিলিটি সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। ফলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে। খুচরা বিক্রেতাদেরও করের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে অগ্রিম কর আদায়ের মাধ্যমে করনেট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ করের হার অপরিবর্তিত থাকলেও করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চাপ বাড়বে।

প্রশ্নহীন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ। জমি, ফ্ল্যাট বা ভবন ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য এবং দলিল মূল্যের পার্থক্য থাকলে করদাতা স্বপ্রণোদিত হয়ে তা ঘোষণা করতে পারবেন। নিয়মিত কর পরিশোধের মাধ্যমে সেই অর্থ বৈধ করা যাবে।
সরকার এটিকে কর প্রশাসনের অংশ হিসেবে দেখালেও সমালোচকরা বলছেন, এটি কার্যত নতুন মোড়কে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ।

ধনীদের ওপর বাড়তি চাপ, সম্পদ কর নয়

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সম্পদ কর চালু করা হয়নি। বিদ্যমান সারচার্জ কাঠামোই বহাল রাখা হয়েছে। তবে বিলাসবহুল গাড়ি, হেলিকপ্টার, আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য বিলাসী খাতে কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। উচ্চ সিসির গাড়ির অগ্রিম আয়কর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। হেলিকপ্টারের নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নে ১০ লাখ টাকা উৎসে কর আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। অপরদিকে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো হয়েছে।

মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তি নাকি নতুন চাপ?

করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে কিছু করদাতা সামান্য স্বস্তি পাবেন।
তবে সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস ও জীবনবিমাসহ বিভিন্ন বিনিয়োগে কর রেয়াত কমানো হচ্ছে। বিশেষ করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাকে আর চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করা হবে না। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীকে আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি মধ্যবিত্তের জন্য বাজেটের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্ত।

ঋণনির্ভর বাজেট, উদ্বেগে উদ্যোক্তারা

প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু ব্যয় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়।
অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা, সরকার যদি ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হবে। ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হবে?

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নিত্যপণ্যে কর ছাড়, কৃষি খাতে প্রণোদনা এবং চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু কর ছাড় দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা, মুদ্রানীতি এবং রাজস্ব নীতির সমন্বয় প্রয়োজন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এক কথায় বলা যায়— করছাড়, করজাল, কল্যাণ ও ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষের বাজেট।
একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চেষ্টা, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বিশাল বাজেট ঘাটতি, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা এবং করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনার কঠিন চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
অর্থাৎ বাজেটের প্রতিশ্রুতি বড়, লক্ষ্যও বড়। এখন প্রশ্ন একটাই— সরকার কি এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখাতে পারবে, নাকি এটি কাগজে-কলমে উচ্চাভিলাষী আরেকটি বাজেট হিসেবেই থেকে যাবে?


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category