• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০১:১৭ পূর্বাহ্ন
Headline
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরলে পস্তাতে হবে না: ক্রিস্টেনসেন ২২ হাজার প্রবাসীর এনআইডি আবেদন বাতিল করলো ইসি হামে এ পর্যন্ত ৬৭৭ শিশুর মৃত্যু , ব্যয়ও বাড়ছে চিকিৎসার ২৩ জুন ঘিরে পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জামায়াত গণতন্ত্রই বিশ্বাস করে না: মির্জা ফখরুল খেলার পাশাপাশি পড়াশোনা-সংস্কৃতিতেও পারদর্শী হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী সরকার বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে চায়: অ্যাটর্নি জেনারেল কাঁচামাল আমদানিতে ৩০% মূল্য সংযোজনের শর্ত বহাল রাখার দাবি বিটিএমএর বকেয়া বেতন দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া আগস্ট থেকেই চলবে ঢাকা-পাবনা ট্রেন: রেলমন্ত্রী

ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যই পরিণত হচ্ছে নতুন পণ্যের কাঁচামালে

Reporter Name / ১৩ Time View
Update : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। তারা প্রায় ৪ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ করছে। তারা জানান, দেশে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার খাতের বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল। তবে দেশে রিসাইক্লিং শিল্প ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হলেও উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিগত সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। উন্নত দেশগুলোতে রিসাইক্লিং শিল্পে কর ছাড়, ভর্তুকি ও গ্রিন ফাইন্যান্স সুবিধা থাকলেও বাংলাদেশে এ ধরনের সহায়তা সীমিত। এছাড়া বর্তমানে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগে অনেক উদ্যোক্তা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
ব্যবহৃত প্লাস্টিককে ঘিরে দেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে নতুন এক সার্কুলার (চক্রাকার) অর্থনীতি, যেখানে বর্জ্যই পরিণত হচ্ছে নতুন পণ্যের কাঁচামালে। এর মাধ্যমে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি কমছে আমদানিনির্ভরতা এবং সাশ্রয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।
তাদের মতে, কার্যকর নীতি সহায়তা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত সংগ্রহ ব্যবস্থা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সবুজ শিল্পে পরিণত হতে পারে।
তারা আরও বলেন, পরিবেশ দূষণের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে পরিচিত প্লাস্টিক বর্জ্যই তখন দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারবে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন প্লাস্টিক কাঁচামাল বা পলিমার রেজিন আমদানি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন, পিভিসি, পিইটি, পলিস্টাইরিন ও এবিএস।
দেশে বড় পরিসরের কোনো পেট্রোকেমিক্যাল বা পলিমার উৎপাদন শিল্প না থাকায় এসব কাঁচামালের জন্য প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। শুধু গৃহস্থালি প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকারই বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বড় অংশই ১০ থেকে ৫০ বার পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু যথাযথ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার অভাবে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ২০০৫ সালের ১৭৮ টন থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৬৪৬ টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৫ বছরে বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। বর্তমানে ঢাকার একজন বাসিন্দা বছরে গড়ে প্রায় ২২.৫ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধারের হার নির্ভর করে প্লাস্টিকের ধরন, দূষণের মাত্রা, ধোয়ার মান, বাছাই দক্ষতা ও ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর। বাংলাদেশে প্রচলিত রিসাইক্লিং ব্যবস্থায় সাধারণত ১ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে প্রায় ০.৭ থেকে ০.৯ কেজি ব্যবহারযোগ্য পুনর্ব্যবহৃত উপাদান পাওয়া যায়।
দেশের সবচেয়ে বড় প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ একইসঙ্গে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্লাস্টিক রিসাইক্লার। ২০১২ সালে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বছরে প্রায় ৬৯ হাজার টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, আরএফএল বছরে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টন প্লাস্টিক ব্যবহার করে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ কাঁচামাল আসে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক থেকে। এই পরিমাণ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে বছরে ৪০০ কোটির টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ১০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির শিল্প পার্কে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের অন্যতম বৃহৎ আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট পরিচালিত হচ্ছে।
গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান টিইএল প্লাস্টিকস দেশে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং খাতে একটি পূর্ণাঙ্গ সার্কুলার অর্থনীতি মডেল গড়ে তুলেছে। প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, ব্যবহার-পরবর্তী বর্জ্য সংগ্রহ, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পুনরায় নতুন পণ্য তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করছে।
টিইএল প্লাস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুল হাসান বলেন, প্লাস্টিককে আর শুধুই বর্জ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার, স্বচ্ছ সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা এবং জাতীয় পর্যায়ে সার্কুলার অর্থনীতি কাঠামো বাস্তবায়ন করা গেলে এই শিল্প আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। বর্তমানে আমরা রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১৫ শতাংশ প্লাস্টিক আমদানি কমিয়ে আনতে পেরেছি।’
প্রাণ-আরএফএলের কর্মকর্তারা জানান, তাদের রিসাইক্লিং কার্যক্রমে সরাসরি প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ কাজ করছেন এবং পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষের। প্রতিষ্ঠানটি এখন সারা দেশে ১২টি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র পরিচালনা করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ১০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পিইটি প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ে ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি ও গ্লোবাল রিসাইকেলড স্ট্যান্ডার্ড সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বিপিসিএল) বছরে প্রায় ১০ হাজার টন পিইটি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও খাদে মাহমুদ ইউসুর গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক কাঁচামাল রপ্তানিতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা রয়েছে। কিন্তু একই কাঁচামাল দেশে পুনর্ব্যবহার করে মূল্য সংযোজনমূলক শিল্পে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো প্রণোদনা নেই। আবার রিসাইক্লিংয়ের জন্য কাঁচামাল আমদানির সুযোগও নেই। ফলে স্থানীয় উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু সেখান থেকেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ কাঁচামাল সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। ‘সরকার এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিলে দেশে পিইটি রিসাইক্লিং শিল্পের ব্যাপক বিকাশের সুযোগ রয়েছে,’ বলেন ইত্নি।
প্লাস্টিক প্রোডাক্ট বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (পিপিবিপিসি) এবং বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্যের বাজার রয়েছে।
এ খাতে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি কারখানায় সরাসরি ২০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাশাপাশি বছরে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
বিপিজিএমইএর সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, দেশে এখন প্রায় ১ হাজার প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বছরে প্রায় ৪ লাখ টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা পেলে এ খাত আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। ‘পরিবেশ সুরক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও রিসাইক্লিং শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।’
দেশে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার খাতের বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল। বর্জ্য সংগ্রহকারী, ভ্যানচালক, টোকাই ও ছোট আড়তদারদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক পুনরায় বাজারে ফিরছে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন বলেন, অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনোভাবেই রিসাইকেল করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। কারণ এটি প্লাস্টিকের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।
তিনি আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যারা প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করছে তাদেরকে অবশ্যই ন্যানো ফাইবার, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রাসায়নিক উপজাত আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। কারন্ন রিসাইকেলের জন্য প্লাস্টিক যখন ক্রাশ করা হয়, তখন ক্ষতিকর উপাদানগুলো পরিবেশে মিশে গিয়ে দূষিত করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্রের।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category