প্রভাত ডেস্ক: মাত্র ১৫ মাস আগে প্রিন্স হ্যারি বলেছিলেন, ‘এমন কোনো পরিস্থিতি আমি কল্পনা করতে পারি না, যেখানে আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদের আবার যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসব।’ রাজপরিবারের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে মীমাংসার অযোগ্য বিরোধ, বৈরী গণমাধ্যম এবং প্রকাশ্যে রাজপরিবারের সমালোচনা করায় ক্ষুব্ধ হওয়া ব্রিটিশ জনসাধারণের তোপের মুখে ২০২০ সালে ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স প্রিন্স হ্যারি ও মেগান যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সে সময় হ্যারি বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার সন্তানদের আমার জন্মভূমি দেখাতে পারব না—এটা সত্যিই খুব দুঃখজনক।’
এখন হ্যারি তা পারবেন। কারণ, প্রিন্স হ্যারি এবং তাঁর স্ত্রী মেগান মার্কেল যুক্তরাজ্যে ফিরে এসে আবার সেখানে বসবাসের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁরা ফিরে আসবেন। এ দম্পতির দুই সন্তান ৭ বছর বয়সী আর্চি ও ৫ বছর বয়সী লিলিবেটকে আগামী সেপ্টেম্বর সেশনে যুক্তরাজ্যের স্কুলে ভর্তি করা হবে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারীরা বলেছেন, পরিবারটি লন্ডনের বাইরে একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকবে।
তাদের এই ফিরে আসা যুক্তরাজ্যের কিছু মানুষের মনে একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তা হলো—কী বদলে গেল?
রাজপরিবারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারীদের মতে, এর একটি কারণ হতে পারে সন্তানদের নিয়ে হ্যারির আকাঙ্ক্ষা। তিনি যেভাবে বড় হয়েছেন, নিজের সন্তানদের তিনি হয়তো তেমনভাবেই বড় করতে চান। তিনি অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে নিজের শৈশবের মধুর স্মৃতি স্মরণ করেন।তবে হ্যারি এ–ও চান, তাঁর সন্তানেরা যেন জনসাধারণের অতিরিক্ত নজরদারি ও সংবাদমাধ্যমের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ছাড়াই সে অভিজ্ঞতা পায়। প্রিন্স হ্যারি বারবার এ বিষয়গুলোর নিন্দা করেছেন।
২০২৩ সালে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আদালতে এক শুনানিতে হ্যারির আইনজীবী তাঁর একটি বিবৃতি পড়ে শোনান। সেখানে হ্যারি বলেন, ‘ব্রিটেন (যুক্তরাজ্য) আমার সন্তানদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি চাই, তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়িতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছে, যুক্তরাজ্যেও যেন ততটাই স্বাচ্ছন্দ্য ও আপন অনুভব করে।’
এ নিয়ে ‘আফটার এলিজাবেথ: ক্যান দ্য মনার্কি সেভ ইটসেলফ?’—বইয়ের লেখক এবং রয়্যাল হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির ফেলো এড ওয়েন্স বলেন, ‘তাঁরা চান, তাঁদের সন্তানেরা যেমন মার্কিন হিসেবে বেড়ে উঠবে, তেমনি যুক্তরাজ্যে নাগরিক হিসেবেও বেড়ে উঠুক। তাঁরা চান, সন্তানেরা তাদের বাবার দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করুক।’ এই লেখক মনে করেন, হ্যারি দ্রুতই ফিরবেন। এখানে আরও কিছু বিষয় কাজ করছে বলেও মনে করেন তিনি।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে, হ্যারির সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ক আরও মেরামত করার সুযোগ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের ক্যানসার ধরা পড়ে। বাকিংহাম প্যালেস জানিয়েছে, চিকিৎসায় চার্লস ভালো সাড়া দিচ্ছেন। তবে গত বছর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হ্যারি বলেছিলেন, ‘আমার বাবা আর কত দিন বেঁচে থাকবেন, তা আমি জানি না।’
গত ছয় বছরে আটলান্টিকের ওপারে থেকে হ্যারি ও মেগান প্রকাশ্যে যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের তীব্র সমালোচনা করে গেছেন। বিবিসিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকার ছিল তার সর্বশেষ অধ্যায়।
অপরাহ উইনফ্রের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে, ‘স্পেয়ার’ নামের একটি বইয়ে এবং নেটফ্লিক্সে ছয় পর্বের প্রামাণ্যচিত্রে হ্যারি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে এমনভাবে ক্ষোভ উগরে দেন, যা এর আগে রাজপরিবারের কোনো সাবেক সদস্য করার সাহস দেখাননি।২০২৫ সালে হ্যারি তাঁর বাবার সঙ্গে রাজার লন্ডনের বাসভবনে চা পান করেন। এটিকে তাঁদের মধ্যকার সম্পর্কের তিক্ততা কাটিয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়। আর গত মাসে হ্যারি ও মেগান তাঁদের সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে গেলে বাবা ও ছেলের সম্পর্কে দূরত্ব আরও কিছুটা কমেছে বলে মনে হয়। পরিবারটি লন্ডনের বাইরে রাজপরিবারের বাসভবন হাইগ্রোভ হাউসে রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে। ওই সাক্ষাতের বিষয়ে জানা আছে—এমন এক ব্যক্তি বলেন, তখন তাঁদের মধ্যে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
এখন রাজা চার্লসের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর সুযোগ যদি আসন্ন এই স্থানান্তরের অন্যতম কারণ হয়ে থাকে, তবু হ্যারির ভাই প্রিন্স অব ওয়েলস উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো উদ্যোগ এখনো চলছে বলে মনে হয় না।
রাজপরিবারের অন্দরমহলের সবকিছু প্রকাশ করে হ্যারির স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’ প্রকাশের সিদ্ধান্তে উইলিয়াম ভীষণ ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে। বিবিসিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে হ্যারি স্বীকার করেছিলেন, ‘আমার পরিবারের কিছু সদস্য আমাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না।’
‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল: রয়্যাল উইমেন অ্যান্ড দেয়ার ব্যাটলস’ বইয়ের লেখক ক্যাথরিন মেয়ার বলেন, ‘হ্যারির সঙ্গে দেখা করতেও উইলিয়ামের অনীহা এবং এ বিষয়ে প্রকাশ্যে নীরব থাকা দেখে মনে হচ্ছে, সম্পর্ক মেরামতের জন্য তিনি এখনো প্রস্তুত নন। এটার জন্য যে মাত্রায় পারস্পরিক আস্থা থাকা প্রয়োজন, তাঁর মধ্যে তা নেই।’
উইলিয়াম ও হ্যারি—দুজনকেই তাঁদের শৈশবের মানসিক আঘাতের ভার বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আর এর ফলে যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁদের প্রতিক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠবে মনে করেন ক্যাথরিন মেয়ার।
এ ছাড়া পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে রয়েছে। হ্যারি বহু বছর ধরে বলে আসছেন, যতক্ষণ না যুক্তরাজ্য সরকার তাঁর পুলিশি নিরাপত্তা পুনর্বহাল করবে, তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে যেতে পারবেন না। রাজপরিবারের কর্তব্যরত সদস্যের ভূমিকা ছেড়ে দেওয়ার পর হ্যারির জন্য সরকার থেকে বরাদ্দ নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। চলতি বছরের শুরুতে হ্যারি ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আইনি চ্যালেঞ্জে হেরে যান।
গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেন, হ্যারি ও মেগানের জন্য যথাযথ মাত্রার নিরাপত্তা কী হওয়া উচিত, সেটি তাঁদের পরিবারের ‘ব্যক্তিগত বিষয়’।