প্রভাত অর্থনীতি: সিঙ্গাপুর এ বছর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক শ্রমবাজার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রথাগত বেশ কয়েকটি গন্তব্যে কর্মী নিয়োগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ৫৫ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশে সেখানে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু বিদেশি কর্মী গ্রহণে সিঙ্গাপুরের কড়াকড়ি আরোপের পরিকল্পনা বাংলাদেশের অভিবাসনের এই সাম্প্রতিক ধারা অব্যাহত রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৫,৬১৪ জন বাংলাদেশি কর্মী সিঙ্গাপুরে গেছেন, যা এই সময়ে অভিবাসনপ্রত্যাশী মোট ৫৩৭,৬৩৭ জন কর্মীর ১০.৩৪ শতাংশ।
২০২২ সালে ৬৪,৩৮৩ জন বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন, যা সে বছরের ১ লাখ ৩৫ হাজার বিদেশগামী কর্মীর ৫.৬৭ শতাংশ ছিল। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা কমে ৫৩,২৬৫ জনে দাঁড়ায়, যখন সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের মোট ১৩ লাখ ৭ হাজার প্রবাসীর ৪.০৮ শতাংশের গন্তব্য ছিল।
২০২৪ সালে কর্মী নিয়োগ কিছুটা বেড়ে ৫৬,৮৪৭১ জনে (১০,১০,৯০৯ জনের মধ্যে ৫.৬২%) পৌঁছায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ৭০,৮৩২ জনে দাঁড়ায়, যা সে বছরের মোট ১,১২৩,৩৬৮ জন প্রবাসীর ৬.২৬ শতাংশ।
এই সময়ে সৌদি আরব যথারীতি ২৯৫,৬৯৫ জন কর্মী নিয়ে বৃহত্তম গন্তব্য হিসেবে অব্যাহত রয়েছে। ওমান, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো বড় শ্রমবাজারগুলোয় বছরের পর বছর ধরে কর্মী নিয়োগ বন্ধ থাকার কারণে সিঙ্গাপুরে এই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর পাশাপাশি সিঙ্গাপুর রেমিট্যান্সের একটি বড় উৎসেও পরিণত হচ্ছে। দেশটি থেকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০২১-২২ অর্থবছরের ৩৮৫.২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪২৩.৩ মিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৩২.৩ মিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৮০.৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ এক লাফে বেড়ে ১.৪৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর দশম বৃহত্তম উৎসে পরিণত হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং বলেছেন যে দেশটি বিদেশি জনশক্তিকে স্বাগত জানানো অব্যাহত রাখবে, তবে তা একটি ‘সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে’। এর পরেই এই বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়। গত ২৩ আগস্ট ন্যাশনাল ডে র্যালিতে ভাষণ দিতে গিয়ে ওং বলেন যে আগামী বছরগুলোতে শ্রমশক্তিসহ সিঙ্গাপুরের মোট জনসংখ্যা আরও ধীরগতিতে বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় নিশ্চিত করব যেন সিঙ্গাপুরবাসীরা নিজ দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে।’ পরিষেবা খাতের ব্যবসাগুলো বিদেশি কর্মীদের সহজলভ্য করার দাবি জানালেও ওং সতর্ক করে দেন যে সামান্য নীতি শিথিলকরণও বিদেশি কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার মাধ্যমেই চালিত হতে হবে।
মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার বলেন, সিঙ্গাপুরের এই পদক্ষেপকে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘সিঙ্গাপুর বিদেশি কর্মী নিয়োগে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ দেশটির অর্থনীতির জন্য অভিবাসী শ্রমিকরা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’ তবে তিনি জানান যে, স্বল্প ও অর্ধদক্ষ কর্মীর চাহিদা কমে গিয়ে দক্ষ ও উচ্চ দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়তে পারে।
সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ বিদেশি কর্মী রয়েছেন। আনুমানিক ২ লাখ বাংলাদেশি সেখানে নির্মাণ, জাহাজ নির্মাণ ও বাগান পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত। তাদের জনমিতিক চ্যালেঞ্জও বেশ প্রকট। গত এক দশকে মোট প্রজনন হার এক দশক আগের ১.২৪ থেকে কমে ২০২৫ সালে ০.৮৭-এ নেমে এসেছে।
সিকদার বলেন যে বাংলাদেশের উচিত চাহিদার এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুর প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং হাই-টেক শিল্পে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা শুধু সাধারণ অর্ধদক্ষ কর্মী পাঠানোর কথা ভেবে যেতে পারি না।’
সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশি কর্মীরা সাধারণত নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দক্ষতা সনদ অর্জন করেন। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত কেন্দ্র প্রায় ২২টি ট্রেডে (প্রধানত নির্মাণ খাতের সাথে সম্পর্কিত) সার্টিফিকেট প্রদানের জন্য অনুমোদিত। স্থানীয় রিক্রুটাররা জানিয়েছেন, নিয়োগকর্তারা একাধিক সার্টিফিকেশনধারী কর্মীদের বেশি পছন্দ করায় নতুন দক্ষতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
উচ্চ অভিবাসন ব্যয় আরেকটি বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরগামী বাংলাদেশি কর্মীরা টিবিএসকে জানিয়েছেন যে চাকরি নিশ্চিত করতে তাঁদের ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। টাঙ্গাইলের লুৎফর মিয়া, যিনি ১৯৯৬ সালে ২ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন, জানান যে নতুন কর্মীদের জন্য খরচ এখন ১৪ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, সিঙ্গাপুরের ছয়টি কোম্পানি মূলত রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ার একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলি ধরে রেখেছে এবং অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ আদায় করছে। তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘প্রকৃত খরচ যেখানে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার মতো হওয়া উচিত, সেখানে কর্মীদের কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, সরকার সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে ডেকে অতিরিক্ত খরচ কোথায় হচ্ছে তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিবাসন খরচ কমাতে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অথরিটি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে বলে তিনি যোগ করেন।
সিঙ্গাপুরের অভিবাসনের পরিসংখ্যান খুব সাবধানে ব্যাখ্যা করা উচিত বলে জানিয়েছেন আহমেদ চৌধুরী, যিনি সিঙ্গাপুরে কর্মী পাঠানো এজেন্সিগুলোর একটি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরে যাওয়া কর্মীদের একটি বড় অংশ প্রথমবার যাওয়া অভিবাসী নন, বরং তারা রিটেইনি বা ফিরে আসা কর্মী। অনেক বাংলাদেশি কর্মী চুক্তি শেষ করে দেশে ফেরেন এবং নতুন ভিসা বা ক্লিয়ারেন্স নিয়ে আবার সিঙ্গাপুরে যান। ফলে শীর্ষ অভিবাসনের পরিসংখ্যানটি অগত্যা সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজারে নতুন বাংলাদেশিদের প্রবেশের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করে না।
এই মুহূর্তে সিঙ্গাপুরের নির্মাণ খাত বিদেশি শ্রমিকদের চাহিদা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশটির নির্মাণ খাত বছরওয়ারি ১১.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা ওই সময় অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী খাত হিসেবে উঠে এসেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকেও (এপ্রিল-জুন) খাতটির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.২ শতাংশ।
নির্মাণ খাতের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির কারণে অভিবাসী শ্রমিকদের চাহিদাও বজায় রয়েছে। একই সময়ে সিঙ্গাপুর বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও নিয়ন্ত্রিত ও দক্ষতাভিত্তিক নীতির দিকে এগোচ্ছে।