• রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন
Headline
মরক্কো ও সেউতার মধ্যবর্তী স্থানে সাগরে ভাসমান প্রতিবন্ধক বসাচ্ছে স্পেন হামলা হলে অন্যান্য দেশের জ্বালানিক্ষেত্র ভস্ম করে দেয়ার হুমকি ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহোতে রেস্তোরাঁয় গুলি, নিহত মস্কোতে রেস্তোরাঁয় বোমা বিস্ফোরণ, হতাহত ২৪ সিজেপির কর্মসূচি ভণ্ডুলের পরিকল্পনা সন্ত্রাসীর, প্রেমিকার ফোনে গ্রেপ্তার পেরুতে পর্যটকবাহী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত, ১৩ আরোহীর সবাই নিহত কারখানা বন্ধ করে ব্যবসা ‘গুটিয়ে নিচ্ছে’ এস আলম গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সীমান্ত বাণিজ্য ফের চালুর প্রস্তাব মিয়ানমারের আসিয়ানে যোগ দেয়া হচ্ছে না বাংলাদেশের, কারণ জানালেন মহাসচিব ইরান যুদ্ধের জেরে তেল কোম্পানির রেকর্ড মুনাফা

২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে স্পেনে ৫০ হাজার মানুষের ঢল

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

প্রভাত ডেস্ক: উত্তর আফ্রিকায় মরক্কোর সীমান্তঘেঁষা স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ২৪ ঘণ্টায় ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষ প্রবেশ করেছেন। মরক্কো থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হতে গিয়ে এ সময় অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সীমান্তের স্পেন অংশে ৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরক্কোর দিকেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
স্পেন জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার ৩০০ জনকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা তাঁরা স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন।
গত কয়েক দিনে মরক্কো এবং স্পেনের ছোট্ট স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতার মধ্যকার সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সীমান্ত পেরিয়ে স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
অভিবাসনপ্রত্যাশী এ মানুষের সংখ্যা ছিল সেউতার স্বাভাবিক জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। এতে গতকাল সেখানে মানবিক সংকট তৈরি হয়।
উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত স্পেনের আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল মেলিইয়া। এটি সেউতা থেকে প্রায় ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত। সেউতা ও মেলিইয়া—দুটি শহর মিলে আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থল সংযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপে পাড়ি জমাতে চাওয়া মানুষেরা প্রায়ই এই দুই সীমান্ত দিয়ে দলে দলে ঢোকার চেষ্টা করেন।
১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেউতায় খ্রিষ্টান ও মুসলমান—উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। স্থানীয় স্প্যানিশ ও মরক্কোর বাসিন্দা এবং সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন কাজ করতে আসা শ্রমিকেরা সেখানে তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ পন্থায় বসবাস করেন।
এত বছর হয়ে গেলেও মরক্কো এখনো সেউতা ও মেলিইয়াকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। অঞ্চল দুটিকে দেশটি ‘অধিকৃত ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখে থাকে।
উন্নত জীবন ও অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে কিংবা নিজ দেশে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ইউরোপে আসতে চাওয়া মানুষের জন্য স্পেন অন্যতম প্রধান গন্তব্য। সে ক্ষেত্রে সেউতা ও মেলিইয়া মরক্কো এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে স্পেনে পৌঁছানোর প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত। তাই এ দুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।
সেউতা বা মেলিইয়ায় পৌঁছালে অনেক অভিবাসীকে তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোয় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে কেউ কেউ স্পেনে আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ পান এবং সে সময় তাঁদের অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়।
সেউতায় পৌঁছাতে অনেকে মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সাঁতরে সীমান্ত অতিক্রম করেন। আবার কেউ কাছের বেলিউনেশ শহর থেকে এ ধরনের চেষ্টা চালান।
এ ধরনের যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২২ সালে প্রায় ২ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টাকালে ২৩ জন প্রাণ হারান। ২০১৪ সালে সেউতায় সীমান্তবেড়া টপকে সাঁতরে ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়।তবে সেউতা ও মেলিলার তুলনায় ক্যানারি ও বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে স্পেনে পৌঁছানো অভিবাসীর সংখ্যা সাধারণত বেশি।
গত কয়েক দশকে স্পেনে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটির ৫ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১ কোটিরই জন্ম অন্য দেশে। তাঁদের অনেকে কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও মরক্কো থেকে এসেছেন এবং কৃষি, পর্যটন, সেবাসহ স্পেনের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করছেন।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রতিবছর উত্তর আফ্রিকা ও তুরস্ক থেকে হাজারো মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে ৩৫ হাজার ১৫৩ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে বা তাঁরা নিখোঁজ হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে এ সংখ্যা ১ হাজার ৪৯৩।
অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে এত মানুষ সীমান্ত পার হলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মরক্কো সরকার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি। সীমান্ত পার হওয়া ঠেকাতে তারা কতটা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল, সেটিও পরিষ্কার নয়। তবে এ ঘটনার সঙ্গে মরক্কো ও আলজেরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সাম্প্রতিক আলজেরিয়া সফরের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ২০২১ সালের মে মাসেও একবার বিপুলসংখ্যক মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন। তখন পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী সংগঠন পলিসারিও ফ্রন্টের নেতাকে করোনা চিকিৎসার জন্য স্পেনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদ্রিদ ও রাবাতের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। ওই সময় মরক্কো সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল।
পশ্চিম সাহারা ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্পেনের উপনিবেশ ছিল। পরে স্পেন অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার কাছে হস্তান্তর করে। মরক্কো ও পলিসারিও ফ্রন্ট—উভয়েই পশ্চিম সাহারাকে নিজেদের বলে দাবি করে।
স্পেন দীর্ঘ সময় পর ২০২২ সালে পশ্চিম সাহারা নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসে এবং মরক্কোর পরিকল্পনাকে সমর্থন করে। এর মধ্য দিয়ে তাদের কূটনৈতিক সংকটের অবসান হয়। কিন্তু এতে পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থনকারী প্রতিবেশী আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
পেদ্রো সানচেজ গত ২০ জুলাই আলজেরিয়া সফর করেন। চার বছরের মধ্যে স্পেনের কোনো প্রধানমন্ত্রীর এটি ছিল প্রথম আলজেরিয়া সফর। এ সফর দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।
সেউতা সফরে গিয়ে সানচেজ বলেন, মানব পাচারকারীরা স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায় নিয়ে গুজব ছড়িয়েছেন। ওই রায়ে বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। তাঁর মতে, গুজবে বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্ত পেরোতে উৎসাহিত হয়েছেন।
তবে ইতালির আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক গবেষণা ইনস্টিটিউটের অভিবাসন বিষয়ের গবেষক মাত্তেও ভিলার মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক কারণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ‘সাধারণত যেখানে মাসে কয়েক শ মানুষ আসেন, সেখানে এক রাতে ৫০ হাজার মানুষ আসার কথা নয়। (সানচেজের) আলজেরিয়া সফর মরক্কো ভালোভাবে নেয়নি।’
ভিলার ধারণা, নিজেদের প্রভাব দেখানোর জন্য মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে থাকতে পারে। কারণ, তারা জানে, এতে ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে। এই গবেষক আরও বলেন, ‘ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে, এমনটি তারা দেখতে চাইতে পারে।’
সীমান্তে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেন অতিরিক্ত পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এ ঘটনাকে ‘স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সীমান্তের বিশৃঙ্খলার ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর স্পেন সরকার চাপে পড়ে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর মধ্যেও মতভেদ দেখা দেয়।
স্পেনের ডানপন্থী রাজনীতিকেরা বলছেন, চলতি বছর কয়েক লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইতালির কট্টর ডানপন্থী সরকার সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন অঞ্চলের অবাধ যাতায়াতের সুবিধা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু সেউতা ও মেলিলা সাধারণভাবে শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। ইতালির এমন অবস্থানের সমালোচনা করে স্পেন বলেছে, এ সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) চুক্তির পরিপন্থী। এদিকে ফ্রান্সও স্পেনের সীমান্তে নিরাপত্তা ও তল্লাশি জোরদার করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category